প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের আবহাওয়ার অস্থিরতা আবারও প্রকট হয়ে উঠেছে। দক্ষিণাঞ্চলে বৃষ্টি ধীরে ধীরে কমে এলেও উত্তরাঞ্চলে বর্ষণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আগামী অন্তত দুই দিন সারাদেশেই বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা, নদী-নালা উপচে পড়া এবং কৃষি জমিতে ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সংস্থাটির ৫১টি কেন্দ্রের মধ্যে ২২টিতে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া আরও ১০-১৫টি কেন্দ্রে বৃষ্টিপাত হয়েছে ভারী বৃষ্টির কাছাকাছি মাত্রায়। ভোলায় সর্বোচ্চ ৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে, যা আবহাওয়াবিদদের মতে মৌসুমি বায়ু এবং গভীর নিম্নচাপের সম্মিলিত প্রভাবে ঘটেছে।
আবহাওয়া বিজ্ঞানে বলা হয়, কোনো এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হলে তাকে ‘ভারী’ এবং ৮৮ মিলিমিটারের বেশি হলে ‘অতি ভারী বৃষ্টি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই হিসেবে গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় রেকর্ড হওয়া বৃষ্টিপাতের মাত্রা স্পষ্টভাবেই উদ্বেগজনক।
আবহাওয়াবিদ শাহানাজ সুলতানা জানিয়েছেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপটির প্রভাব বর্তমানে ভারতের বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, ওডিশা এবং বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এর ফলে গতকাল থেকে আজ শুক্রবার পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী বর্ষণ হচ্ছে। রাজধানী ঢাকাতেও শুক্রবার ভোর থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত টানা ভারী বৃষ্টি হয়েছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে অফিসগামী মানুষ এবং শিক্ষার্থীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। ঢাকার আকাশ এখনো মেঘে আচ্ছন্ন এবং সারাদিন বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শাহানাজ সুলতানা আরও জানিয়েছেন, বিশেষ করে রাজশাহী, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে বৃষ্টির তীব্রতা সবচেয়ে বেশি হতে পারে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা কমলেও উত্তরাঞ্চলে বর্ষণ বেড়ে যাওয়ায় সেখানে ফসলি জমি, গ্রামীণ সড়ক ও নিম্নাঞ্চলগুলোতে পানিবন্দি পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
গভীর নিম্নচাপের কারণে সমুদ্র উত্তাল থাকায় দেশের চারটি সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। জেলেদের সমুদ্রে মাছ ধরতে না যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে। যারা ইতিমধ্যে সমুদ্রে আছেন, তাদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে আসতে বা গভীর সমুদ্র এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের ওপর বয়ে যাওয়া বাতাসের গতি বেড়ে যাওয়ায় জাহাজ ও ট্রলারগুলোকে অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
সাধারণত অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাদেশে মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকে। এই সময়ের মধ্যে একাধিকবার নিম্নচাপ বা গভীর নিম্নচাপ সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। চলতি বছরের গভীর নিম্নচাপটি পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হয়ে প্রথমে উপকূলীয় অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করেছিল। তখন বরিশাল, খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় টানা বর্ষণে নদ-নদীর পানি বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি সড়ক ও গ্রামীণ অবকাঠামোতে ক্ষতি হয়। কিন্তু এখন নিম্নচাপটির প্রভাব উত্তরমুখী হওয়ায় রাজশাহী, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের মানুষকে নতুন করে বৃষ্টির তীব্রতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
অতিবৃষ্টির কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে আমন ধান, শাকসবজি এবং বিভিন্ন মৌসুমি ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যদি টানা ভারী বর্ষণ আরও দুই দিন অব্যাহত থাকে, তাহলে ব্যাপক ফসলের ক্ষতি হতে পারে।
গ্রামীণ সড়ক ও নিচু বসতির ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে বলে জানা গেছে। অনেকে আবার আশঙ্কা করছেন, যদি বৃষ্টি অব্যাহত থাকে, তাহলে নদ-নদীর পানি বেড়ে বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। যদিও পানি উন্নয়ন বোর্ড এখনই বড় কোনো আশঙ্কা দেখছে না, তবুও অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে উত্তরের তিস্তা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ঢাকা শহরে বর্ষণের কারণে যানজট ও জলাবদ্ধতা এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভোর থেকে হওয়া প্রবল বৃষ্টিতে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, কলাবাগান, শান্তিনগর, মুগদা ও পুরান ঢাকার অনেক এলাকা পানিতে ডুবে গেছে। অফিসগামী মানুষকে রিকশা কিংবা হাঁটাহাঁটি করে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী অন্তত দুই দিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে, যদিও তা কিছুটা বিচ্ছিন্ন আকারে হবে। অর্থাৎ কোথাও ভারী, কোথাও হালকা বৃষ্টি হতে পারে। তবে উত্তরের জেলাগুলোতে পরিস্থিতি আরও কিছুটা কঠিন হতে পারে। এ কারণে সেখানকার মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ ক্রমেই দুর্বল হতে শুরু করলেও এর প্রভাব পুরোপুরি কেটে যেতে সময় লাগবে। এ সময়ের মধ্যে সমুদ্র উত্তাল থাকতে পারে এবং দেশের ভেতরে ছড়িয়ে পড়া বৃষ্টি পরিস্থিতি স্থায়ীভাবে কমতে আরও কয়েক দিন লাগতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য বর্ষা মৌসুম যেমন কৃষি উৎপাদনে আশীর্বাদ, তেমনি অতিবৃষ্টি হয়ে দাঁড়ায় অভিশাপ। দক্ষিণে বৃষ্টি কমে এলেও উত্তরাঞ্চলে এর চাপ বেড়ে যাওয়ায় সেখানকার মানুষকে নতুন করে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। অতিবৃষ্টি কৃষিতে ক্ষতি, অবকাঠামোতে ধ্বংস এবং মানুষের জীবনযাত্রায় অচলাবস্থা সৃষ্টি করতে পারে। তাই আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্ক বার্তাগুলো গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করা জরুরি। আগামী দুই দিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।