বিজয়া দেখতে গিয়ে প্রবাস ফেরত শংকর মালোর করুণ মৃত্যু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৬০ বার
বিজয়া দেখতে গিয়ে

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

গাজীপুরের কালিয়াকৈরের ডুবাইল গ্রামের প্রবাসফেরত শংকর মালো কুয়েত থেকে দেশে ফিরে পূজার আনন্দ ভাগাভাগি করতে এসে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন। বৃহস্পতিবার বিকেলে কালিয়াকৈরের বকশীবাড়ি কলেজ রোড এলাকায় দুটি অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটে এই দুর্ঘটনা, যা আনন্দঘন মুহূর্তকে মুহূর্তেই পরিণত করে গভীর শোকে।

৪৫ বছর বয়সী শংকর মালো ছিলেন ডুবাইল গ্রামের মনমোহন চন্দ্র মালোর ছেলে। নয় দিন আগে পূজার ছুটিতে কুয়েত থেকে বাড়িতে ফেরেন তিনি। দীর্ঘ প্রবাস জীবনের ক্লান্তি পেছনে ফেলে তিনি চেয়েছিলেন স্ত্রী ও তিন মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে মাতৃভূমির উৎসবমুখর আবহে কাটাতে কিছু মূল্যবান সময়। বিশেষ করে দুর্গাপূজার বিজয়া দশমী দেখতে যাওয়ার সেই প্রত্যাশিত ভ্রমণই হয়ে উঠলো তাঁর জীবনের শেষ যাত্রা।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, বৃহস্পতিবার বিকেলে শংকর মালো পরিবারের সঙ্গে বিজয়া দেখতে বের হন। কালিয়াকৈরের বকশীবাড়ি কলেজ রোড এলাকায় পৌঁছালে দুটি অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। অভিঘাতে তিনি গুরুতর আহত হন। এলাকাবাসী দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার বাইরে বড় কোনো সুবিধা না থাকায় তাঁকে মির্জাপুরের কুমুদিনী হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

কালিয়াকৈর থানার ওসি (অপারেশন) যোবায়ের আহমেদ জানান, শংকর মালো দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করেন। তবে এ ঘটনায় এখনও পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। বছরজুড়ে প্রবাসীরা পরিবার-পরিজনের সঙ্গে এই উৎসব ভাগাভাগি করার জন্য অপেক্ষা করেন। শংকর মালোও ছিলেন সেই অপেক্ষমাণ হাজারো প্রবাসীর একজন। বিজয়ার আনন্দ দেখতে বের হয়েছিলেন তিনি, সঙ্গে ছিল তাঁর স্ত্রী ও তিন মেয়ে। কিন্তু হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনা শুধু একটি পরিবারকেই শোকে নিমজ্জিত করেনি, বরং পুরো গ্রামকেই স্তব্ধ করেছে।

স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, পূজার দিনগুলোতে গ্রামের প্রতিটি বাড়ি থাকে উৎসবমুখর, আনন্দে ভরে ওঠে পরিবেশ। তবে শংকর মালোর মৃত্যুতে সেই আনন্দ মুহূর্তেই ছাপিয়ে গেছে বিষাদের ছায়া। তাঁর পরিবার এখন শোকে স্তব্ধ, আর গ্রামের মানুষদের মুখে শুধু একটি প্রশ্ন—এমন প্রাণহানি কি এড়ানো যেত না?

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এক নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে কয়েক ডজন মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন সড়ক দুর্ঘটনায়। অটোরিকশা, মোটরসাইকেল এবং অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের কারণে দুর্ঘটনার হার বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে উৎসবকেন্দ্রিক সময়ে যখন মানুষের যাতায়াত বেড়ে যায়, তখন দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেশি হয়।

শংকর মালোর মৃত্যুও সেই চিত্রকেই আরও স্পষ্ট করে তুললো। স্থানীয়রা বলছেন, এলাকায় অটোরিকশার আধিক্য এবং চালকদের বেপরোয়া গতিই অনেক সময় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া অনেক চালকেরই যথাযথ প্রশিক্ষণ নেই, নেই ট্রাফিক নিয়ম মানার মানসিকতা। ফলে জীবননাশী ঝুঁকি বেড়ে যায়।

কুয়েতের মতো দেশে প্রবাসী জীবন যাপন করা সহজ নয়। শংকর মালোও দীর্ঘদিনের কষ্টের বিনিময়ে পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে সমর্থন দিয়ে এসেছেন। পরিবারের সুখ-শান্তির জন্য যিনি ভিনদেশে রোজগার করছিলেন, সেই মানুষটির এমন অকাল মৃত্যু তাঁর পরিবারের জন্য অসহনীয় আঘাত হয়ে এসেছে। স্ত্রী ও তিন মেয়েকে নিয়ে তাঁর যে স্বপ্ন ছিল, তা মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হলো।

পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনা নিয়ে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে সাধারণত এমন ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয় চালকদের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, কর্তৃপক্ষ দ্রুত তদন্ত করে দায়ী চালকদের চিহ্নিত করবে এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

শংকর মালোর মৃত্যু নিছক একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনার অনিয়ন্ত্রিত বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। পরিবার, সমাজ এবং প্রবাসী জীবনের সঙ্গে যুক্ত এক করুণ অধ্যায় হয়ে রইলো এই ঘটনা। তিনি বিজয়ার আনন্দ দেখতে বের হয়েছিলেন, কিন্তু সেই আনন্দ পরিণত হলো অনন্ত বেদনায়।

স্থানীয়দের কথায়, শংকর মালো ছিলেন সহজ-সরল একজন মানুষ। প্রবাস জীবনে অর্জিত প্রতিটি টাকায় তিনি পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়তে চেয়েছিলেন। আজ তাঁর মৃত্যুতে শুধু তাঁর পরিবার নয়, পুরো ডুবাইল গ্রাম শোকে স্তব্ধ।

এই দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে, বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা কতটা নড়বড়ে অবস্থায় আছে। প্রতিদিন যেভাবে জীবন হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ, তা যেন অব্যাহত এক শোকগাঁথা। শংকর মালোর মৃত্যু সেই শোকগাঁথারই একটি বেদনাদায়ক সংযোজন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত