প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
সিলেটের মোগলাবাজারে ট্রেন দুর্ঘটনার উদ্ধারকাজ শেষে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন বাংলাদেশ রেলওয়ের এক নিবেদিতপ্রাণ প্রকৌশলী। কুলাউড়া রেলওয়ে সেকশনের উপসহকারী প্রকৌশলী (পথ) মোজাম্মেল হক মঙ্গলবার রাতে ফেরার পথে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হন। দায়িত্ব পালন শেষে এই মৃত্যু রেলওয়ে পরিবারসহ সহকর্মীদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নামিয়েছে।
বুধবার (৮ অক্টোবর) দুপুরে এ তথ্য নিশ্চিত করেন কুলাউড়া রেলওয়ে স্টেশনমাস্টার মো. রোমান আহমদ। তিনি জানান, মঙ্গলবার সকালে সিলেটের মোগলাবাজার এলাকায় উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিনসহ চারটি বগি লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় সারাদেশের সঙ্গে সিলেটের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়ে। দুর্ঘটনার পরপরই কুলাউড়া রেলওয়ে বিভাগের প্রকৌশলী মোজাম্মেল হক উদ্ধার কাজে অংশ নিতে ঘটনাস্থলে যান।
রেললাইন মেরামত ও বগি উদ্ধারের কাজ শেষ করে গভীর রাতে তিনি মোটরসাইকেলযোগে কুলাউড়ায় ফিরছিলেন। ফেরার পথে উপজেলার ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের একটি বাঁকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ে মারাত্মকভাবে আহত হন। স্থানীয়রা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে সিলেট এম.এ.জি. ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার সকালেই তার মৃত্যু হয়।
এই দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে কুলাউড়া ও সিলেট রেলওয়ে বিভাগের কর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারানো এই প্রকৌশলীর মৃত্যুতে সহকর্মীরা গভীর শ্রদ্ধা ও শোক প্রকাশ করেছেন। অনেকেই জানিয়েছেন, মোজাম্মেল হক ছিলেন নিষ্ঠাবান, পরিশ্রমী ও পেশাদারিত্বে অনন্য একজন কর্মকর্তা। দুর্ঘটনার খবরটি জানাজানি হতেই তার কর্মস্থলে নেমে আসে শোকের নীরবতা।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, মোজাম্মেল হক দীর্ঘদিন ধরে কুলাউড়া রেলওয়ে সেকশনে কর্মরত ছিলেন। ট্রেন চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে তিনি প্রায়ই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজ করতেন। সিলেট অঞ্চলের দুর্গম ও পাহাড়ি রেলপথে কাজ করা প্রকৌশলীদের জন্য এটি প্রায়ই কঠিন দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়, যেখানে যেকোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে। তবুও দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি প্রতিবার এগিয়ে যেতেন—শেষবারের মতোও যেমন গিয়েছিলেন দুর্ঘটনাস্থলে উদ্ধার কাজে অংশ নিতে।
উদ্ধার কার্যক্রমের সময় সহকর্মীরা জানিয়েছেন, ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হওয়ার পর সারারাত কাজ করেছেন মোজাম্মেল হক ও তার দল। ক্লান্ত শরীর নিয়েও তিনি সবাইকে সাহস জুগিয়েছিলেন। রাতভর পরিশ্রম শেষে কাজ শেষ করে যখন ফেরার পথে ছিলেন, তখনই ঘটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি।
রেলওয়ে স্টেশনমাস্টার রোমান আহমদ বলেন, “মোজাম্মেল ভাই ছিলেন খুবই দায়িত্বশীল প্রকৌশলী। রেললাইন সচল করতে তিনি অনেক কষ্ট করেছেন। তার মৃত্যু আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।”
এদিকে দুর্ঘটনার বিষয়টি কুলাউড়া থানা বা রেলওয়ে থানা অবগত নয় বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনা ঘটার পর দ্রুতই এলাকাবাসী তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়, কিন্তু ঘটনার আনুষ্ঠানিক তথ্য তখন পর্যন্ত থানায় পৌঁছায়নি।
রেলওয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা ঘটনাটি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে নিহত প্রকৌশলীর পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন তারা। রেলওয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “মোজাম্মেল হক তার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন। এটি এক ধরনের শহীদত্বের মতোই। রেলওয়ে পরিবার তার আত্মত্যাগ চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।”
তার অকাল মৃত্যুর খবরে শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রকৌশল সমিতি ও কুলাউড়া রেলওয়ে কর্মচারী ইউনিয়ন। তারা জানান, “তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী ও বিনয়ী মানুষ। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন—এটি আমাদের সকলের জন্য গভীর বেদনার।”
সিলেট অঞ্চলের রেলপথের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণে যেসব প্রকৌশলী প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন, মোজাম্মেল হক ছিলেন তাদের অন্যতম একজন। তার মৃত্যুর ঘটনাটি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে এই সেক্টরের কর্মপরিবেশ ও ঝুঁকির বাস্তবতা।
শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে যাওয়া এই প্রকৌশলীকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে সহকর্মীরা। রেলওয়ের নিরাপত্তা ও সেবার মান উন্নয়নে নিজের জীবন উৎসর্গ করা মোজাম্মেল হকের এই আত্মত্যাগ হয়তো অনেককে আরও দায়িত্বশীল হতে অনুপ্রাণিত করবে। তার মৃত্যু এক প্রমাণ—পর্দার আড়ালে থেকেও দেশের চলাচল সচল রাখার পেছনে কত নাম না জানা মানুষ জীবন বাজি রাখেন প্রতিদিন।