প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
কক্সবাজারের টেকনাফে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের বাইরে অবৈধভাবে বসবাসের অভিযোগে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ২৮ রোহিঙ্গাকে আটক করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। একই অভিযানে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে স্থানীয় এক ব্যক্তিকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রোববার (১২ অক্টোবর) গভীর রাতে টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের পশ্চিম সিকদারপাড়া এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করে র্যাব-১৫।
র্যাবের তথ্য অনুযায়ী, আটক আশ্রয়দাতা বোরহান উদ্দিন (১৮) হ্নীলা ইউনিয়নের পশ্চিম সিকদারপাড়ার রশিদ আহমেদের ছেলে। তাঁর ঘরে আশ্রয় নিয়েছিল উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবির থেকে পালিয়ে আসা অন্তত ২৮ জন রোহিঙ্গা নাগরিক। তাঁদের মধ্যে নারী, শিশু ও বৃদ্ধরাও ছিলেন।
র্যাব-১৫ কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের সহকারী পরিচালক (আইন ও গণমাধ্যম) ও সহকারী পুলিশ সুপার আ. ম. ফারুক সোমবার দুপুরে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, র্যাবের গোয়েন্দা নজরদারিতে জানা যায়, সম্প্রতি কিছু রোহিঙ্গা শিবির ত্যাগ করে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে বাসাভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেছে। তাঁদের মধ্যে অনেকেই মাদক পাচার, মানব পাচার, ছিনতাই, ডাকাতি ও হত্যার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এ ছাড়া কিছু রোহিঙ্গা স্থানীয়দের সহায়তায় জায়গা কিনে ঘর-বাড়ি তৈরির চেষ্টাও করছে।
এমন তথ্যের ভিত্তিতে র্যাব হ্নীলা ইউনিয়নের পশ্চিম সিকদারপাড়া এলাকায় অভিযান চালায়। মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত অভিযান চলে। অভিযানে অবৈধভাবে বসবাসকারী ২৮ রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়। তাঁদের অধিকাংশই উখিয়া ও টেকনাফের আশ্রয়শিবির থেকে পালিয়ে এসেছিল বলে জানায় র্যাব।
র্যাব কর্মকর্তা আ. ম. ফারুক বলেন, “রোহিঙ্গাদের নিজ নিজ আশ্রয়শিবিরে ফেরত পাঠাতে এবং আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে আমরা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করছি। আটক ব্যক্তিদের টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।”
এদিকে, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, সম্প্রতি টেকনাফে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দাতা হিসেবে বেশ কয়েকজন স্থানীয় নাগরিককেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সূত্রমতে, গত এক সপ্তাহে টেকনাফ ও উখিয়ার বিভিন্ন এলাকায় রোহিঙ্গা আশ্রয়বিরোধী অভিযানে মোট ৭৮ জন রোহিঙ্গা ও চারজন আশ্রয়দাতাকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭ অক্টোবর দুজন আশ্রয়দাতা ও ১৩ জন রোহিঙ্গা, ৮ অক্টোবর হ্নীলা থেকে একজন নারী আশ্রয়দাতা ও ৩৭ জন রোহিঙ্গা, এবং সর্বশেষ ১২ অক্টোবর আরও ২৮ জন রোহিঙ্গা ও এক আশ্রয়দাতাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমারের চলমান সংঘাত ও সীমান্তের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে কিছু রোহিঙ্গা পরিবার শিবির ছেড়ে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছে। তাঁরা অনেক সময় স্থানীয়দের কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে বাসাভাড়া নেয় বা আত্মগোপন করে। তবে এই প্রবণতা দিন দিন বাড়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আমিন বলেন, “রোহিঙ্গারা অনেক সময় স্থানীয়দের ছদ্মবেশে কাজ করে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ চোরাচালান বা মাদক বাণিজ্যে জড়িত। এতে আমাদের এলাকাতেও ঝুঁকি বাড়ছে।”
অন্যদিকে, মানবাধিকারকর্মীদের একটি অংশ বলছেন, আশ্রয়শিবিরে দীর্ঘদিন অনিশ্চিত জীবনযাপন ও কর্মসংস্থানের অভাবের কারণে অনেক রোহিঙ্গা বিকল্প পথ খুঁজছে। তবে তাঁরা একে অপরাধ হিসেবে নয়, বরং মানবিক সংকট হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।
র্যাব ও স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ভবিষ্যতে সীমান্তবর্তী এলাকা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে এ ধরনের অভিযান আরও জোরদার করা হবে। যেসব ব্যক্তি রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে আশ্রয় দিচ্ছে, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইসঙ্গে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়শিবিরে ফেরত পাঠানোর কাজ চলমান থাকবে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান শুরুর পর বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয়। তাঁদের বেশিরভাগই কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার ৩৩টি শিবিরে অবস্থান করছেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিবিরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান, এমনকি খুনোখুনিও বেড়ে গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গাদের একটি অংশ আশ্রয়শিবিরের বাইরে অবৈধভাবে বসবাস শুরু করায় এ অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে।
র্যাবের একজন কর্মকর্তা বলেন, “আমরা চাই না কোনো নিরীহ মানুষ কষ্ট পাক, তবে আইন ভঙ্গ হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান মানবিক ও আইনগত দুই দিক থেকেই বিবেচনা করা হচ্ছে।”
সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর জানিয়েছে, রোহিঙ্গা পুনর্বাসন ও পুনরায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। তবে ততদিন পর্যন্ত দেশের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সীমান্ত এলাকায় নজরদারি আরও বাড়ানো হবে বলে জানানো হয়েছে।