সুনামগঞ্জে যাদুকাটা নদীর তীর রক্ষায় বাঁশের বেড়া দিয়ে বালু লুট রোধের উদ্যোগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩১ বার
সুনামগঞ্জে যাদুকাটা নদীর তীর রক্ষায় বাঁশের বেড়া দিয়ে বালু লুট রোধের উদ্যোগ

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

সুনামগঞ্জের যাদুকাটা নদীর তীরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন রোধে অবশেষে বাঁশের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কয়েকদিন ধরে এলাকাবাসীর আন্দোলন, বিক্ষোভ, স্মারকলিপি ও পাহারার পর প্রশাসনের নির্দেশে এবং ইজারাদারদের উদ্যোগে এই বেড়া নির্মাণ শুরু হয়। নদীর তীরবর্তী লাউড়েরগড় এলাকায় গতকাল রোববার বিকেল থেকে কাজ শুরু হয়েছে, যা আজ সোমবারও অব্যাহত রয়েছে।

গত এক সপ্তাহ ধরে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী লাউড়েরগড় এলাকায় নদীর পাড় কেটে বালু তোলার ঘটনা আলোচনায় আসে। স্থানীয়রা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বিষয়ে ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করলে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়। জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় এই বিষয়টি তীব্র ক্ষোভের সঙ্গে উত্থাপন করেন তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান।

এরপর জেলা প্রশাসন অবৈধ বালু তোলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দ্রুত টাস্কফোর্স গঠন করে। টাস্কফোর্সে বিজিবি, পুলিশ, আনসার, পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা এবং উপজেলা প্রশাসনের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। তাদের মাধ্যমে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযান সাময়িক হলেও বালু লুট বন্ধ হয়নি। একদিকে রাতের অন্ধকারে চক্রগুলো সক্রিয় থাকে, অন্যদিকে কিছু প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় এই অবৈধ কর্মকাণ্ড চলতেই থাকে।

তাহিরপুরের লাউড়েরগড় এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হান্নান বলেন, “দিনে প্রশাসন আসে, ছবি তোলে, চলে যায়। রাতে আবার ট্রলার ও বাল্কহেড চলে আসে। নদীর পাড় ধসে যাচ্ছে, আমাদের ঘরবাড়িও ঝুঁকিতে।” একই এলাকার আরেক বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, “বালু তোলার কারণে নদীর পাড় ভেঙে যাচ্ছে। কয়েকদিন আগে আমার বাড়ির কাছেই মাটি ধসে পড়ে গেছে।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর পাড়ের জমি বিক্রি করে অনেকেই দ্রুত অর্থ উপার্জনের পথ বেছে নিচ্ছেন। প্রভাবশালী একটি চক্র এসব জমি কিনে বালু বিক্রির ব্যবসায় লিপ্ত। তাদের সহায়তা করছে কিছু স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গও। এমনকি সরকারি খাস জমি থেকেও বালু তোলার অভিযোগ উঠেছে। এই চক্রের কারণে নদীর পরিবেশ, তীরবর্তী গ্রাম ও স্থাপনাগুলো মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

যাদুকাটা নদীর বালুমহাল দুটি সুনামগঞ্জ জেলার সবচেয়ে বড়। প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে এই বালুমহাল দুইটির ইজারা মূল্য প্রায় ১০৭ কোটি টাকা। মামলাজনিত জটিলতা কেটে যাওয়ার পর এ মাসেই বালুমহাল হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু ইজারাদার সীমানার বাইরে গিয়ে লাউড়েরগড় এলাকায় বালু তোলার অভিযোগ ওঠে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে স্থানীয়রা বিক্ষোভে নামেন এবং বালু তোলার স্থানগুলোতে পাহারা বসান।

বালুমহালের ইজারাদার শাহ রুবেল আহমদ বলেন, “আমরা চাই নদীর তীর যেন অক্ষত থাকে। কিন্তু স্থানীয় কিছু লোক নিজের জমি বিক্রি করে দিচ্ছে। অন্যরা সেই জমি কিনে বালু বিক্রি করছে। এতে আমাদের নাম খারাপ হচ্ছে। আমরা প্রশাসনের কাছে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের আবেদন করেছি এবং বালু লুট ঠেকাতে বাধ্য হয়ে বাঁশের বেড়া দিচ্ছি।”

অন্যদিকে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, “নদীর তীর কেটে কেউ যেন বালু তুলতে না পারে, সে বিষয়ে আমরা খুবই কঠোর অবস্থানে আছি। ইতোমধ্যে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এতে বিজিবি, পুলিশ, আনসার ও পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ক্রমে এলাকায় অবস্থান করছেন।”

তিনি আরও বলেন, “ইজারাদারকেও নিয়ম মেনে বালু উত্তোলন করতে হবে। পরিবেশের ক্ষতি বা জনবসতির ঝুঁকি সৃষ্টি হয় এমন কোনো কাজ প্রশাসন বরদাশত করবে না।”

এদিকে, নদীর পাড়ে বাঁশের বেড়া নির্মাণ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি দেখা দিয়েছে। তারা আশা করছেন, এতে অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও বালু লুট ঠেকানো সম্ভব হবে। তবে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, প্রশাসনের নজরদারি কমলেই আবার চক্রগুলো সক্রিয় হয়ে উঠবে।

যাদুকাটা নদী শুধুমাত্র তাহিরপুর নয়, পুরো সুনামগঞ্জ জেলার প্রাণ। এই নদীর বালু স্থানীয় অর্থনীতির অংশ হলেও অযাচিত উত্তোলনে নদীর ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, হুমকির মুখে পড়ছে নদীতীরবর্তী গ্রাম ও কৃষিজমি। নদী বাঁচাতে প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয়দেরও সচেতন হতে হবে—এমনটাই মনে করছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

মানবিক দিক থেকেও এই নদী সুরক্ষার বিষয়টি এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠী ও বালু ব্যবসায়ীদের অমানবিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা এবং প্রশাসনের কঠোর অবস্থানই পারে যাদুকাটা নদীর অস্তিত্ব রক্ষা করতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত