প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে পাট কাটাকে কেন্দ্র করে বাবাকে হত্যা করার দায়ে ছেলে জসিম মিয়া (৪৩)-এর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে তাকে এক লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বুধবার দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ও দায়রা জজ মো. শহিদুল ইসলাম এ রায় ঘোষণা করেন।
রায়ের পর আদালতে উপস্থিত জনতার মধ্যে স্বস্তি ও বেদনার মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। কেউ কেউ বলছিলেন, রক্তের সম্পর্কের এমন মর্মান্তিক পরিণতি সমাজের জন্য এক সতর্কবার্তা।
আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট দুপুরে নবীনগর উপজেলার জিনোদপুর ইউনিয়নের কাঁঠালিয়া গ্রামে পাট কাটাকে কেন্দ্র করে বৃদ্ধ লিল মিয়া (৭৫) ও তার ছেলে জসিম উদ্দিনের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা তখন পাশে থাকলেও, উত্তেজনার মুহূর্তে জসিম ঘর থেকে কাঠের ছিয়া (স্থানীয়ভাবে ‘ছাহাইট’ নামে পরিচিত) এনে পিতার মাথায় একের পর এক আঘাত করেন। রক্তাক্ত অবস্থায় লিল মিয়া মাটিতে লুটিয়ে পড়লে প্রতিবেশীরা তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যায়, তবে চিকিৎসক তখনই মৃত ঘোষণা করেন।
এই হত্যাকাণ্ডে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। পিতা হত্যার ঘটনায় শোকাহত স্ত্রী মমতাজ বেগম নবীনগর থানায় ছেলে জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। পুলিশ দ্রুত জসিমকে গ্রেপ্তার করে এবং ঘটনার তদন্ত শুরু করে। তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল পুলিশ আদালতে চার্জশিট দাখিল করে, যেখানে জসিমকে হত্যার মূল দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
মামলাটি বিচার প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট। আদালত একই বছরের ৭ অক্টোবর আসামির বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ৩০২/৩২৩ ধারায় আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করেন। দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে বিচারক বুধবার রায় ঘোষণা করেন। আদালত বলেন, প্রমাণিত হয়েছে যে জসিম উদ্দিন পরিকল্পিতভাবে তার পিতার ওপর প্রাণঘাতী আঘাত হেনেছেন, যা তার মৃত্যু ঘটায়। তাই তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড দেওয়া হলো।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ফখরুদ্দিন খান বলেন, “এই রায় ন্যায়বিচারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পিতা হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের যথোপযুক্ত শাস্তি হয়েছে। আমরা রায়ে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট।”
অন্যদিকে আসামি পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট নাজমুল হক রিটন বলেন, “এই রায়ে আমরা সংক্ষুব্ধ। আমরা বিশ্বাস করি, জসিম উদ্দিন ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করেননি; এটি ছিল এক মুহূর্তের উত্তেজনা। আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করব।”
গ্রামের মানুষের কাছে এই হত্যাকাণ্ড ছিল এক বেদনাদায়ক ঘটনা। নিহত লিল মিয়া ছিলেন এলাকার এক সম্মানিত প্রবীণ ব্যক্তি। স্থানীয়রা জানান, তিনি ছিলেন পরিশ্রমী, ধর্মপরায়ণ ও শান্ত স্বভাবের মানুষ। তার মৃত্যুর পর থেকে পরিবারটি ভেঙে পড়েছে। প্রতিবেশীরা বলেন, “একজন ছেলে কিভাবে নিজের বাবাকে হত্যা করতে পারে—এটা আমাদের কল্পনার বাইরে।”
এই ঘটনার পর থেকে এলাকায় পরিবারিক সহিংসতা ও পারিবারিক কলহ বিষয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এমন হত্যাকাণ্ডগুলো শুধুমাত্র পারিবারিক নয়; এর পেছনে রয়েছে সমাজে ক্রমবর্ধমান মানসিক চাপ, আর্থিক টানাপোড়েন ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব।
এ রায়ের মাধ্যমে একদিকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলেও, অন্যদিকে একটি পরিবার চিরতরে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। পিতাকে হারিয়ে পরিবার শোকে নিস্তব্ধ, আর পুত্র জসিম এখন কারাগারের অন্ধকারে নিজের কাজের পরিণতি ভোগ করবেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই মামলাটি আমাদের সমাজে এক গভীর বার্তা রেখে যায়—রাগ, সহিংসতা ও অস্থিরতা কখনোই সমাধান নয়। মানবিক মূল্যবোধ হারালে রক্তের সম্পর্কও বিষাক্ত হয়ে যায়, আর সেই সম্পর্কের ট্র্যাজেডি ছুঁয়ে যায় পুরো সমাজকে।