প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়, দেশে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৫৮ জন নতুন রোগী। এই পরিস্থিতি চলতি বছর ডেঙ্গুর বিস্তারকে আরও উদ্বেগজনক করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে ২০২ জনই রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় বসবাসকারী। ঢাকার বাইরে অন্যান্য বিভাগেও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ঢাকার অন্যান্য অঞ্চলে ভর্তি হয়েছেন ১৫৮ জন, চট্টগ্রামে ৮৫ জন, বরিশালে ১৩৩ জন, ময়মনসিংহে ৫০ জন, খুলনায় ৬২ জন, রংপুরে ১৯ জন, রাজশাহীতে ৪৭ জন এবং সিলেটে ২ জন রোগী। এ তথ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে যে ডেঙ্গুর বিস্তার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে।
চলতি বছরের হিসাব অনুযায়ী, ডেঙ্গু জ্বরে এখন পর্যন্ত মোট ২৪২ জনের মৃত্যু ঘটেছে। পাশাপাশি, এই বছরের শুরু থেকে এখনও পর্যন্ত ৫৭,০১৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সতর্ক করেছে যে, মৌসুমি পরিবর্তন ও বৃষ্টিপাতের কারণে এডিস মশার প্রজনন বৃদ্ধি পাওয়ায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনতে জনগণকে সচেতন হতে হবে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।
ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেশে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এডিস মশা নিধন কর্মসূচি, রোগী সনাক্তকরণ, জরুরি স্বাস্থ্য সেবা সম্প্রসারণ এবং জনগণকে সচেতন করার প্রচেষ্টা জোরদার করা হয়েছে। তবে শহরাঞ্চলে জলাবদ্ধতা, আবর্জনার স্তুপ এবং পরিত্যক্ত পানির স্তর ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধুমাত্র সরকারি প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। জনগণকেও বাড়ি, আশেপাশের এলাকা এবং পানির উৎস পরিষ্কার রাখতে হবে। ডেঙ্গুর শুরুতে উপসর্গ শনাক্ত করতে পারলে চিকিৎসা দ্রুত নেওয়া সম্ভব, যা জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া, রোগীর অবস্থার তত্ত্বাবধানে থাকা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করাও অপরিহার্য।
ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের সাধারণ উপসর্গের মধ্যে জ্বর, মাথা ব্যথা, মাংসপেশিতে ব্যথা, চোখে ব্যথা এবং ত্বকে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। তবে গুরত্বপূর্ণ হলো, কিছু রোগী ডেঙ্গু হেমোরাজিক ফিভার বা ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হয়ে জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারেন। তাই প্রাথমিক সতর্কতা এবং দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছে, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে শহর ও গ্রামাঞ্চলে সমন্বিত প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল এবং জনসমাগমের স্থানগুলোতে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে, ডেঙ্গু সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে জনসাধারণকে নিয়মিত তথ্য দেওয়া হচ্ছে।
ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে সাধারণ মানুষকে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো মেনে চলার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরামর্শ দিয়েছে: পানি জমে থাকা স্থানগুলো মুছে ফেলা, আবর্জনা সঠিক স্থানে ফেলা, বাসা ও আশেপাশের এলাকা পরিষ্কার রাখা, নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করা।
চলতি বছরের এই ঋতুতে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, রোগের ঝুঁকি কমাতে এবং মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সকলকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং প্রজননক্ষম নারী গোষ্ঠীকে অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত আপডেট জনসাধারণকে পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন রাখছে। এ বছরের পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যাচ্ছে, ঢাকা শহর এখনও এডিস মশার প্রজননের প্রধান কেন্দ্র। তবে অন্যান্য বিভাগেও আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কম নয়, যা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
সচেতনতা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং সরকারি পদক্ষেপে সক্রিয় অংশগ্রহণই ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে কার্যকর হতে পারে। এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ না করা হলে, দেশে আরও বিপুলসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হতে পারে এবং মৃত্যুর হার আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। সরকারের পাশাপাশি জনগণের সমন্বিত উদ্যোগই আগামী দিনে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে।