১৫ নভেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের প্রস্তুতি শেষের নির্দেশ প্রধান উপদেষ্টার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৬৩ বার
১৫ নভেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের প্রস্তুতি শেষের নির্দেশ প্রধান উপদেষ্টার

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি দ্রুততর করতে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। বুধবার (২৯ অক্টোবর) দুপুরে প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন ‘যমুনা’-তে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে তিনি নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, “১৫ নভেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি শেষ করতে হবে।”

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন নির্বাচন কমিশন (ইসি)-এর সদস্যবৃন্দ, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। মূল আলোচ্য বিষয় ছিল— আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, প্রযুক্তিগত সহায়তা, ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা এবং ভুয়া তথ্য বা গুজব মোকাবিলা।

বৈঠক শেষে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রশাসনিক প্রস্তুতির গতি বাড়াতে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “১৫ নভেম্বরের মধ্যে নির্বাচন কমিশন যেন মাঠপর্যায়ের সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করে, সেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

শফিকুল আলম জানান, নির্বাচন কমিশন এবার পোস্টাল ভোটের জন্য একটি আধুনিক অ্যাপ চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী ভোটারদের অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেবে। তিনি বলেন, “এই অ্যাপের মাধ্যমে প্রবাসী ভোটাররা নিবন্ধন ও ভোট প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবেন। এটি ই-গভর্ন্যান্সের একটি বড় পদক্ষেপ হবে।”

এছাড়া বৈঠকে নির্বাচনের আগে ও পরে সম্ভাব্য অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েও আলোচনা হয়। প্রেস সচিব বলেন, “নির্বাচনের আগের ৭২ ঘণ্টা এবং পরের ৭২ ঘণ্টা কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তা নিয়েও বিস্তারিত পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত থাকবে।”

তিনি আরও জানান, নির্বাচনী কর্মকর্তা নিয়োগে এবার বিশেষ নজর দেওয়া হবে। আগের তিনটি নির্বাচনে যারা দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তাদের অনেকে বিতর্কিত ভূমিকা রাখার অভিযোগে এবার আর দায়িত্বে থাকবেন না। বরং, নতুন কর্মকর্তা নিয়োগে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা হবে।

গুজব ও ভুয়া তথ্য মোকাবিলার জন্য সরকার বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে বলেও জানান প্রেস সচিব। তিনি বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও ডিজইনফর্মেশন ঠেকাতে দুটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। একটি কমিটি শুধুমাত্র ফেসবুক, ইউটিউব ও এক্স (টুইটার) পর্যবেক্ষণ করবে, আরেকটি কাজ করবে সংবাদ যাচাই ও প্রতিক্রিয়া প্রদানের দায়িত্বে। ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও আলোচনা চলছে।”

নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়েও বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়। শফিকুল আলম বলেন, সেনাবাহিনী নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সেনা বাহিনী জানিয়েছে, ৯২,৫০০ সদস্য নির্বাচনকালে দায়িত্ব পালন করবেন, যার মধ্যে প্রায় ৯০ হাজার সেনা সদস্য এবং বাকিরা নৌবাহিনীর সদস্য। এছাড়া আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীও ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত থাকবে। তিনি বলেন, “নির্বাচনে সর্বাধিক মাঠ দায়িত্বে থাকবে আনসার বাহিনী। পুলিশের সদস্যদের জন্য নতুনভাবে বডি ক্যামেরা সরবরাহ করা হবে, যাতে ভোটকেন্দ্রে কোনো অনিয়ম হলে তা সঙ্গে সঙ্গে প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষিত থাকে।”

প্রেস সচিব আরও জানান, প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণের সুযোগ না থাকে। ভোটারদের নিরাপত্তা ও আস্থা নিশ্চিত করতে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে।

বৈঠকে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল— নির্বাচন বানচাল বা অস্থিরতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা প্রতিরোধ। প্রেস সচিব বলেন, “নির্বাচন বানচালের চেষ্টা রুখে দিতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত।”

এ সময় তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রসঙ্গও তোলেন। প্রেস সচিবের বক্তব্য অনুযায়ী, “একবিংশ শতকে শেখ হাসিনার চেয়ে বড় খুনি আর কেউ নেই— জাতিসংঘের প্রতিবেদনে এ কথা উল্লেখ আছে।” যদিও তার এ বক্তব্য রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, তবে তিনি বলেন, “কেউ কোনো অপকর্ম করে পার পাবে না, সরকার সে অনুযায়ী কাজ করছে।”

শফিকুল আলম দাবি করেন, দেশের আইন ও প্রশাসন এখন সম্পূর্ণভাবে নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে। তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। সরকার শুধু সহায়তা দিচ্ছে, হস্তক্ষেপ নয়।”

প্রেস ব্রিফিংয়ের সময় প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, এবার নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দল আসার বিষয়েও আলোচনা চলছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং কমনওয়েলথের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ পাঠানো হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠক ছিল নির্বাচনের আগে সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলোর একটি। প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশ স্পষ্ট— নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রস্তুতি সম্পন্ন না হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির মুখে পড়তে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুব আরেফিন বলেন, “এই নির্দেশনার মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা একটি বার্তা দিয়েছেন— নির্বাচন বিলম্ব বা অনিশ্চয়তার জায়গা নেই। এটি সরকারের আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ।”

তবে কিছু রাজনৈতিক দল এখনো নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা রাখতে পারছে না। তারা অভিযোগ করছে, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি সরকারের হাতে রয়েছে এবং নিরপেক্ষ পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। বিএনপির একাধিক নেতৃবৃন্দ মন্তব্য করেছেন, “নির্বাচনের প্রস্তুতি নয়, আগে রাজনৈতিক আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।”

অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনের প্রস্তুতিকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা বলছে, “এটাই প্রমাণ করে সরকার একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।”

প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনার পর নির্বাচন কমিশন দ্রুত মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু করেছে। ভোটকেন্দ্রের তালিকা হালনাগাদ, ভোটার শনাক্তকরণ ও ব্যালট সামগ্রী বিতরণের কাজ জোরেশোরে চলছে। কমিশনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “এবার নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা হবে প্রযুক্তিনির্ভর, যাতে অনিয়ম বা জালিয়াতির সুযোগ কমে আসে।”

সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন নির্বাচনী উত্তাপ বাড়ছে। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই তফসিল ঘোষণার সম্ভাবনা প্রবল। এর আগে প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা প্রস্তুতি চূড়ান্ত করতে এই বৈঠক ছিল প্রধান উপদেষ্টার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।

দেশের সাধারণ নাগরিকদের প্রত্যাশা, বহু আলোচিত এই নির্বাচন যেন হয় শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক। কারণ দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর মানুষ এখন চায় একটি স্থিতিশীল ও আস্থার বাংলাদেশ, যেখানে নির্বাচনের ফলাফল নয়— জনগণের ভোটই হবে গণতন্ত্রের প্রকৃত ভিত্তি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com