প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের লক্ষাধিক প্রবাসী কর্মীর কঠোর পরিশ্রম ও আত্মত্যাগের ফলেই টিকে আছে বাংলাদেশি অর্থনীতির এক বড় স্তম্ভ। সেই ধারাবাহিকতায় সদ্য সমাপ্ত অক্টোবর মাসেও প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে রেখেছেন উজ্জ্বল অবদান। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অক্টোবর মাসে দেশে এসেছে ২৫৬ কোটি ৩৪ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় দাঁড়ায় প্রায় ৩১ হাজার ১৩১ কোটি টাকার বেশি।
অক্টোবরের ৩১ দিনজুড়ে প্রতিদিন গড়ে দেশে এসেছে ৮ কোটি ২৭ লাখ ডলার। অর্থাৎ প্রতিটি দিনই প্রবাসীদের পাঠানো টাকায় নতুন করে জোগান মিলেছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারে। এই আয় শুধু পরিবারকে স্বস্তি দেয়নি, বরং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকেও কিছুটা স্থিতিশীলতা দিয়েছে।
রোববার (২ নভেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রবাসীদের পাঠানো এই বিপুল অঙ্কের অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে এসেছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ৪৭ কোটি ৭৮ লাখ ডলার, বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ২৪ কোটি ২ লাখ ডলার এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে সবচেয়ে বড় অংশ, অর্থাৎ ১৮৩ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। এছাড়াও বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে দেশে এসেছে ৬৬ লাখ ৭০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স।
এই প্রবাহ প্রমাণ করে যে, দেশের ব্যাংকিং চ্যানেলের প্রতি প্রবাসীদের আস্থা বাড়ছে, বিশেষত সরকার নির্ধারিত প্রণোদনা এবং প্রবাসীদের জন্য চালু করা সহজতর রেমিট্যান্স ব্যবস্থার কারণে। রেমিট্যান্স প্রেরণে হুন্ডি বা অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতির ব্যবহার অনেকাংশে কমে এসেছে বলে জানাচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।
তবে অক্টোবর মাসের এই অর্জন সেপ্টেম্বরের তুলনায় কিছুটা কম। গত সেপ্টেম্বরে দেশে এসেছিল ২৬৮ কোটি ৫৫ লাখ ৬০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স, যা অক্টোবরের তুলনায় প্রায় ১২ কোটি ডলার বেশি। যদিও আগস্টে প্রবাসীরা পাঠিয়েছিলেন ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ডলার এবং জুলাইয়ে ২৪৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার, সুতরাং অক্টোবরের আয় এখনো গত কয়েক মাসের গড়ের চেয়ে ভালো অবস্থানে আছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সামান্য তারতম্য রেমিট্যান্স প্রবাহের স্বাভাবিক ওঠানামার অংশ। বিশেষ সময়, যেমন—পবিত্র ঈদ বা অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে রেমিট্যান্স প্রবাহ সাধারণত বেড়ে যায়, আর অন্যান্য মাসে কিছুটা কমে আসে। তবে বড় চিত্রে দেখা যায়, রেমিট্যান্স প্রবাহ স্থিতিশীল রয়েছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের জন্য আশার আলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার প্রদত্ত ২.৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা এখনো প্রবাসীদের আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত করছে। পাশাপাশি ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোও এখন আগের তুলনায় দ্রুত ও স্বচ্ছ সেবা দিচ্ছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কর্মরত প্রবাসীরা সহজে পরিবারের কাছে টাকা পাঠাতে পারছেন।
রেমিট্যান্সের এই ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে কাজ করছে। দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি বড় অংশই আসে প্রবাসী আয়ে, যা কৃষি ও পোশাক খাতের পরেই সবচেয়ে বড় উৎস। বর্তমানে প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত রয়েছেন, যারা পরিবার ও দেশের অর্থনীতিকে সমর্থন দিচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, যদি সরকার আনুষ্ঠানিক রেমিট্যান্স চ্যানেলগুলো আরও আধুনিক করে, ডিজিটাল লেনদেন প্রক্রিয়া সহজ করে এবং প্রবাসীদের জন্য অতিরিক্ত প্রণোদনা দেয়, তবে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বৃদ্ধি পাবে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও আরও শক্তিশালী হবে, যা মুদ্রা বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে।
বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ কিছুটা চাপের মুখে থাকলেও প্রবাসী আয়ের এই প্রবাহ অর্থনীতিকে ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে প্রবাসীদের পাঠানো এই অর্থ বিনিয়োগ ও উৎপাদনমুখী খাতে ব্যবহারের পরিকল্পনা নিতে হবে, যাতে এই অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হয়।
মানবিক দিক থেকেও রেমিট্যান্স বাংলাদেশের লাখো পরিবারের জীবনযাত্রায় আশীর্বাদ হিসেবে কাজ করছে। প্রবাসীরা যে অর্থ পাঠান, তা দিয়ে তাদের পরিবার চালাচ্ছে সংসার, সন্তানদের পড়াশোনা, বাড়িঘর তৈরি এবং ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করছে। এই অর্থ শুধু একটি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়—এটি লাখো স্বপ্ন ও আত্মত্যাগের প্রতিচ্ছবি।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং বিশ্লেষকরা আশা করছেন, বছরের শেষ দুই মাসে, বিশেষ করে ডিসেম্বরে, রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়বে। কারণ প্রবাসীরা সাধারণত বছরের শেষের দিকে দেশে টাকা পাঠাতে আগ্রহী হন পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে।
সব মিলিয়ে, অক্টোবরের ২৫৬ কোটি ৩৪ লাখ ডলারের এই রেমিট্যান্স শুধু একটি সংখ্যা নয়—এটি বাংলাদেশের প্রবাসীদের পরিশ্রম, দেশের প্রতি তাদের ভালোবাসা এবং অর্থনীতির প্রতি তাদের আস্থার প্রতীক। সরকারের পক্ষ থেকে যদি এই আস্থা আরও সুদৃঢ় করা যায়, তবে আগামী মাসগুলোতে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও রেকর্ড গড়তে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।










