প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শান্ত শহরটি শনিবার সকাল থেকেই যেন এক ভিন্ন ব্যস্ততার আবহে মেতে ওঠে। মহানন্দা নদীর পাড় ঘেঁষে নির্মিত নতুন রাবার ড্যাম ঘিরে মানুষের ভিড়, স্থানীয়দের কৌতূহল আর রাজনৈতিক কর্মীদের সরব উপস্থিতি পুরো পরিবেশকে রঙিন করে তোলে। এমনই সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেখানে পৌঁছান, এবং নদী, পরিবেশ ও দেশের সার্বিক রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ঘিরে করা এক প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন—“সবার আগে ভারতের দাদাগিরি বন্ধ করতে হবে।” তার কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, দেশের প্রতি উদ্বেগ আর জনগণের পক্ষে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার।
দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ২৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রাবার ড্যাম পরিদর্শনে গিয়ে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। এই ড্যামটি স্থানীয় কৃষি, সেচ, মৎস্যসম্পদ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে স্থানীয় প্রশাসন দাবি করেছে। কিন্তু ফখরুলের কথায় উঠে আসে ভিন্ন এক দৃষ্টিভঙ্গি—নদীর পানি, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং দেশের সার্বভৌম প্রয়োজনে সরকারের অবস্থান কতটা শক্তিশালী, সেটিই যেন মূল প্রশ্ন।
তিনি বলেন, “আমার দেশের স্বার্থ আমাকে দেখতে হবে। প্রতিটি দেশই তার স্বার্থ দেখে থাকে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার না থাকলে সেই স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতা কমে যায়, দাবিও আদায় করা যায় না।” তার মতে, নির্বাচন ছাড়া ক্ষমতায় থাকা সরকার কিংবা জোর করে ক্ষমতা দখল করা সরকার কখনোই প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সাথে সমান মর্যাদায় আলোচনায় বসতে পারে না। বক্তব্যে স্পষ্টভাবেই তিনি ইঙ্গিত দেন বর্তমান সরকারের প্রতি—যাদের সময়কালে ভারতের সঙ্গে ন্যায্য দাবি আদায়ে বাংলাদেশ বারবার পিছিয়ে গেছে বলে অভিযোগ।
ফখরুল বলেন, “পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় এবং সীমান্ত হত্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমরা দেখেছি বিগত সরকার বরং দেশের উপর চাপ বাড়তে দিয়েছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অবশ্যই চাই, কারণ তারা স্বাধীনতার সময় আমাদের সহযোগিতা করেছে। কিন্তু সুসম্পর্ক মানে আত্মসমর্পণ নয়। আমরা চাই সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক।” তিনি আরও যোগ করেন যে, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে বিএনপি জনগণের দাবিকে সামনে রেখে দেশের স্বার্থে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আলোচনায় বসবে।
তার কথায় উঠে আসে বাংলাদেশের নদীসংকটের গভীর উদ্বেগ। “বাংলাদেশ মূলত নদীমাতৃক দেশ। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা—এই তিন নদী আমাদের প্রাণ। অথচ পদ্মার পানি আটকে দিয়ে মানুষের জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে।” তার অভিযোগ, নদীর প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার প্রভাব কেবল নদীতীরবর্তী মানুষ নয়, কৃষি, পরিবেশ, পানি নিরাপত্তা এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটেই বিএনপি ‘পদ্মা বাঁচাও আন্দোলন’ শুরু করেছে, যা শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং একটি জাতীয় চেতনার আন্দোলন বলে দাবি করেন তিনি।
ফখরুল বলেন, এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য শুধু দেশব্যাপী নয়, বৈশ্বিক সচেতনতা তৈরি করা। “আমরা মানুষের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করতে চাই, সচেতনতা বাড়াতে চাই। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমাগত হুমকির মধ্যে যদি আমরা নদীগুলো বাঁচাতে না পারি, পরিবেশ রক্ষা করতে না পারি—তবে দেশটাকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।” তার বক্তব্যে ফুটে ওঠে পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষায় এক ধরনের জরুরি আহ্বান, যা রাজনৈতিক বিতর্ক ছাড়িয়ে সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
মহানন্দা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে ফখরুলের বক্তব্য স্থানীয় মানুষের মধ্যেও আলোড়ন সৃষ্টি করে। অনেকেই বলেন, নদীর পানি কমে যাওয়ার ফলে কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে, মাছের প্রজনন কমে গেছে এবং নদী ঘিরে গড়ে ওঠা স্থানীয় অর্থনীতি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। রাবার ড্যাম নির্মাণকে তারা স্বাগত জানালেও, সীমান্তের ওপারে পানি নিয়ন্ত্রণের কারণে যে সমস্যা তৈরি হচ্ছে, তা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের প্রয়োজন বলেই মনে করেন।
এদিন বৃহৎ সমাবেশের প্রস্তুতিও ছিল লক্ষণীয়। নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজ মাঠে দুপুর ২টায় বিএনপির ‘পদ্মা বাঁচাও’ গণসমাবেশের জন্য কয়েকদিন ধরেই স্থানীয় নেতাকর্মীরা কাজ করছিলেন। পরিবেশ, নদী রক্ষা, জাতীয় স্বার্থ, সীমান্ত হত্যা—বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এক ধরনের জনমত তৈরি হয়েছে এলাকাজুড়ে। মাঠজুড়ে ব্যানার, পোস্টার লাগানো হয়েছে, স্লোগানে মুখর হয়ে উঠেছে আশপাশের এলাকা।
বিএনপি মহাসচিবের কথায় রাজনৈতিক সুর থাকলেও, তা শুধু দলীয় রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি দেশের স্বার্থ রক্ষায় সরকার পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। বলেন, “নির্বাচিত সরকার ছাড়া দেশের স্বার্থে বড় কোনো দাবি আদায় করা যায় না। জনগণের শক্তি থাকলে, সরকার দাবি আদায়ে সাহসী ভূমিকা নিতে পারে। আর জনগণকে বাদ দিয়ে, অবৈধভাবে ক্ষমতা ধরে রেখে কোনো সরকারই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টেবিলে শক্ত অবস্থান নিতে পারে না।”
তিনি মনে করেন, সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যার ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে চললেও শক্তিশালী অবস্থান না নেওয়ার কারণেই তা বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। পানির ন্যায্য প্রাপ্তির দাবি দীর্ঘদিনের হলেও, কার্যকর সমাধানের দিকে আগানো হয়নি বলেও সমালোচনা করেন তিনি। ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মানজনক সম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষে মত দিয়ে তিনি বলেন, “প্রতিবেশি দেশ হিসেবে ভারতের সহযোগিতা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের ওপর কোনো ধরনের আধিপত্য বা দাদাগিরি আমরা বরদাশত করতে চাই না। সুসম্পর্কের ভিত্তিই হবে ন্যায় ও সমতা।”
চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙন, পানি সংকট এবং সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি। এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্য যেন তাদের প্রত্যাশা ও ক্ষোভের প্রতিফলন। স্থানীয় অনেকেই বলেন, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ যত দ্রুত নেওয়া যাবে, দেশের জন্য তত ভালো।
গণসমাবেশ ঘিরে যে উৎসাহ দেখা গেছে, তা শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিকে সফল করার উচ্ছ্বাস নয়; বরং মানুষের আশা—দেশের নদী, পরিবেশ এবং স্বার্থ রক্ষায় ভবিষ্যতে যেন শক্তিশালী ভূমিকা পালন করা হয়। সমাবেশে হাজারো মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করেছে, নদী ও পরিবেশ আজ আর শুধু নীতি নির্ধারকদের আলোচনার বিষয় নয়; এটি সরাসরি মানুষের জীবন, জীবিকা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
দিনের শেষে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহানন্দা নদীর তীর যেন আরও একবার মনে করিয়ে দেয়—বাংলাদেশের নদীগুলো শুধু পানির উৎস নয়, জাতির অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। আর সেই ভিত্তি রক্ষাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কথায় তাই এই বার্তাই ছিল সবচেয়ে জোরালো—“নদী বাঁচাতে হবে, দেশ বাঁচাতে হবে, আর সবার আগে বন্ধ করতে হবে দাদাগিরি।”










