প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চীনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর নিংবোতে বিয়ের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ায় নতুন উদ্যোগ হাতে নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। শহরের সিভিল অ্যাফেয়ার্স বিভাগ তাদের অফিসিয়াল উইচ্যাট অ্যাকাউন্টে ঘোষণা করেছে, নতুনভাবে বিবাহিত দম্পতিরা নগদ ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অনুদান পাবেন। প্রত্যেক দম্পতির জন্য নির্ধারিত এই ভাউচারের মূল্য মোট ১,০০০ ইউয়ান, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৪১ ডলার বা ১০৭ পাউন্ড সমতুল্য। এই ভাউচারগুলো বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন, ফটোগ্রাফি, উদযাপন, হোটেল বুকিং, কেনাকাটা এবং অন্যান্য বিয়ে-সংশ্লিষ্ট সেবায় ব্যবহার করা যাবে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, এই ভাউচারগুলো সীমিত সংখ্যক এবং ‘আগে আসলে আগে পাবেন’ নীতিতে বিতরণ করা হবে। কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেছেন, নতুন দম্পতিদের জন্য এই প্রণোদনা বিয়ের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করবে এবং স্থানীয় বিয়ের অনুষ্ঠানকে উৎসাহিত করবে। নিংবোর এই উদ্যোগটি শুধুমাত্র নগদ অর্থ প্রদান নয়, বরং সামাজিকভাবে বিয়ের মূল্যবোধ ও পরিবার গঠনের প্রতি ইতিবাচক প্রভাব ফেলার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্রিটিশ ইন্ডিপেনডেন্ট জানায়, নিংবোর পাশাপাশি পূর্ব চীনের হাংঝৌ, পিংহু সহ কয়েকটি শহরও অনুরূপ নগদ ভাউচার স্কিম চালু করেছে। তবে এসব স্কিম বছরের শেষ পর্যন্ত সীমিত সময়ের জন্য প্রযোজ্য হবে এবং মূল লক্ষ্য হল তরুণ দম্পতিদের বিয়ে ও পরিবার গঠনের জন্য উৎসাহিত করা।
চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর দেশটিতে ৬১ লাখের বেশি দম্পতি বিয়ে নিবন্ধন করেছেন। এই সংখ্যা ২০২৩ সালের ৭৬.৮ লাখের তুলনায় প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কম। অর্থাৎ, মাত্র দুই বছরে দেশটিতে বিয়ের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মূলত শিশুপালন, উচ্চ শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শহুরে জীবনের চাপই এই প্রবণতার প্রধান কারণ। বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে তরুণদের চাকরি, আবাসন ও অন্যান্য আর্থ-সামাজিক চ্যালেঞ্জ বিয়ের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
এ অবস্থায় বেইজিং সরকার ইতিমধ্যেই বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যাতে বিয়ের হার ও শিশুপালনের হার পুনরায় বৃদ্ধির দিকে যায়। এর মধ্যে অন্যতম উদ্যোগ হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘ভালোবাসা শিক্ষা’ চালু করা। এই শিক্ষায় তরুণদের বিয়ে, সন্তানধারণ এবং পরিবার গঠনের গুরুত্ব বোঝানো হয়। পাশাপাশি তাদেরকে সম্পর্ক ও পরিবারিক দায়িত্ব পালনের জন্য মানসিক প্রস্তুতি প্রদান করা হয়।
স্থানীয় প্রশাসন ও শহরের সিভিল অ্যাফেয়ার্স বিভাগ আরও জানিয়েছে, নতুন বিয়ে সংক্রান্ত এই ভাউচারের লক্ষ্য শুধু আর্থিক সহায়তা দেওয়া নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বিয়ের গুরুত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এতে করে তরুণ দম্পতিদের মধ্যে বিয়ের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হবে এবং পরিবারিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চীনে বিয়ের হ্রাস ও জনসংখ্যার স্থিতিশীলতা সংক্রান্ত বিষয়গুলি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতি নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিয়ের হার কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জন্মনিয়ন্ত্রণ নীতি, শিশু ও শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি, এবং পরিবারিক সহায়তার অভাব তরুণদের বিয়ে এবং পরিবার গঠনের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। এই প্রেক্ষাপটে নগদ ভাউচার প্রদানের উদ্যোগ একটি প্রণোদনা হিসেবে কাজ করবে।
নাগরিক সমাজ ও স্থানীয় বাসিন্দারা এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। অনেকেই মনে করছেন, নগদ ভাউচার দম্পতিদের জন্য আর্থিক চাপ কিছুটা কমাবে এবং বিয়ের অনুষ্ঠান সহজ ও আনন্দদায়ক হবে। বিশেষ করে উচ্চ ব্যয় ও শহুরে জীবনের চাপে অনেক তরুণ দীর্ঘ সময় বিয়ে স্থগিত রাখেন। এই প্রণোদনা সেই চাপ কিছুটা কমিয়ে দেবে বলে আশা প্রকাশ করছেন স্থানীয়রা।
চীনা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, নগদ ভাউচার প্রদান ছাড়াও অন্যান্য সহায়তামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, নতুন বিবাহিত দম্পতিদের জন্য হোটেল বুকিংয়ে ছাড়, বিবাহ অনুষ্ঠানের স্থান সংরক্ষণে সরকারি প্রণোদনা, বিয়ের ফটোগ্রাফি ও অন্যান্য সেবায় ভর্তুকি এবং শিশু জন্মের সময় চিকিৎসা ও শিক্ষা সংক্রান্ত সহায়তা। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার তরুণদের মধ্যে পরিবার গঠনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরিতে সহায়তা করছে।
এই উদ্যোগ চীনের নিংবো শহরকে একটি উদাহরণ হিসেবে তৈরি করেছে, যেখানে তরুণ দম্পতিদের আর্থিক ও সামাজিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে বিয়ের হার বাড়ানোর চেষ্টার দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, অন্যান্য শহর ও প্রদেশগুলোও এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে, যাতে দেশে মোট বিয়ের হার পুনরুদ্ধার হয় এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।
এভাবে চীনের নিংবোতে নগদ ভাউচার প্রদান নতুন দম্পতিদের জন্য অর্থনৈতিক সহায়তা ও উৎসাহের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বিয়ের গুরুত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি কার্যকর উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নগদ সহায়তার পাশাপাশি শিক্ষা ও পরিবারিক নীতির সংহতি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করবে।










