নারী শরীরের নীরব ঘাতক: বাংলাদেশসহ এশিয়ায় ভয়াবহ হারে বাড়ছে জরায়ুমুখ ক্যান্সার

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৩ জুলাই, ২০২৫
  • ৪৫ বার

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশসহ সমগ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দিন দিন বেড়ে চলেছে নারীদের জন্য একটি প্রাণঘাতী স্বাস্থ্যঝুঁকি জরায়ুমুখ ক্যান্সার বা সার্ভিকাল ক্যান্সার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নারীদের ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ এটি। শুধু বাংলাদেশেই নয়, ভারত, নেপাল, মিয়ানমার, পাকিস্তানসহ পুরো অঞ্চলে এই রোগে আক্রান্ত নারীর সংখ্যা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, জরায়ুমুখ ক্যান্সারের মূল কারণ হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV) নামের একধরনের সংক্রমণ, যা যৌন সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়। এই ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর দীর্ঘ সময় কোনো লক্ষণ না দিয়েই ধীরে ধীরে ক্যান্সারে রূপ নেয়। বাংলাদেশে HPV সংক্রমণের হার তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও, বেশিরভাগ নারী জানেন না যে তারা ঝুঁকির মুখে রয়েছেন। লজ্জা, সামাজিক কুসংস্কার, চিকিৎসা সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং দারিদ্র্যের কারণে অনেকেই উপসর্গ দেখেও চিকিৎসা নিতে দেরি করেন।

বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় ১২ হাজার নারী জরায়ুমুখ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং তাদের মধ্যে প্রায় ৭ হাজার নারী এই রোগে মারা যান। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মনে করে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু রোগী এখনো রেজিস্ট্রারে অন্তর্ভুক্তই হয় না। দক্ষিণ এশিয়ায় এই রোগে মৃত্যুর হার প্রতি এক লাখ নারীর মধ্যে ১২ থেকে ১৭ জন, যেখানে উন্নত বিশ্বে এই হার মাত্র ২-৩ জন। ভারতে প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার নারী এ রোগে আক্রান্ত হন এবং মৃত্যুবরণ করেন প্রায় ৬৭ হাজারের বেশি নারী।

২০২৪ সালে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সার্বিকভাবে এশিয়ায় নারীদের ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর প্রায় ২০ শতাংশের জন্য দায়ী জরায়ুমুখ ক্যান্সার। এই অঞ্চলের মোট ক্যান্সার আক্রান্ত নারীদের এক-তৃতীয়াংশই ভুগছেন এই রোগে।

কিন্তু এই ভয়াবহতা সত্ত্বেও, সচেতনতা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা অত্যন্ত সীমিত। HPV টিকা বৈশ্বিকভাবে কার্যকর প্রমাণিত হলেও বাংলাদেশে এটি এখনও সীমিত আকারে দেওয়া হচ্ছে। ২০২৩ সালে সরকার স্কুলভিত্তিক টিকাদান কর্মসূচি চালু করলেও তা দেশের সব অঞ্চলে পৌঁছেনি। বিশেষ করে গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের মধ্যে এই টিকা নিয়ে সচেতনতা এবং গ্রহণযোগ্যতা অত্যন্ত কম।

স্ক্রিনিং পদ্ধতি যেমন VIA বা প্যাপ টেস্টের ব্যবহারেও রয়েছে ভয়াবহ উদাসীনতা। এর সঙ্গে আছে আর্থিক সংকট, নারীস্বাস্থ্যকেন্দ্রের অভাব এবং প্রশিক্ষিত ডাক্তার বা নার্সের ঘাটতি। বেশিরভাগ নারী যখন চিকিৎসা নিতে আসেন, তখন রোগটি পৌঁছে গেছে চূড়ান্ত ধাপে যেখানে চিকিৎসা ব্যয়বহুল, দীর্ঘমেয়াদি এবং সফলতার সম্ভাবনা কম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি রোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল—স্কুল স্তর থেকে সচেতনতা গড়ে তোলা, সামাজিক কুসংস্কার দূর করা, বিনামূল্যে HPV টিকা প্রদান এবং জাতীয় পর্যায়ে নিয়মিত স্ক্রিনিং কর্মসূচি চালু করা।

এই রোগ পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য এবং প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। অথচ উন্নত দেশগুলো যখন এই রোগ প্রায় নির্মূল করে ফেলছে, তখন বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নারীরা আজও লড়ছেন নীরবভাবে, অসহায়ভাবে।

এই প্রেক্ষাপটে যদি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো আরও সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসে, তাহলে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলাতে পারে। দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ নারীদের জন্য HPV টিকা বিনামূল্যে সরবরাহ, স্ক্রিনিং কার্যক্রমে অর্থায়ন, স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং ক্যান্সার চিকিৎসাকেন্দ্রে কারিগরি সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে লাখ লাখ নারীকে বাঁচানো সম্ভব। শুধু স্বাস্থ্য নয়, এটি নারীর অধিকার, মর্যাদা ও ভবিষ্যতের লড়াই। এই অন্ধকার থেকে উত্তরণের জন্য এখন দরকার একটি আন্তর্জাতিক ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস।

সময় এখনই। নয়তো প্রতিদিন শত শত নারী হারিয়ে যাবেন এমন একটি রোগে, যা প্রতিরোধযোগ্য ছিল, নিরাময়যোগ্য ছিল—শুধু তাদের পাশে কেউ ছিল না।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত