প্রকাশ: ৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পটুয়াখালীর বাউফলে গভীর রাতে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে দেশের মহাসড়ক নিরাপত্তার প্রশ্ন। ঢাকাগামী একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে গেলে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান বাসের সুপারভাইজার, আর আহত হন অন্তত ১০ জন যাত্রী। আহতদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে।
রোববার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার কিছু পর বাউফল উপজেলার বাউফল-ঢাকা মহাসড়কের আফসার গ্যারেজ এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। গভীর রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ বিকট শব্দে এলাকাবাসী ছুটে আসেন ঘটনাস্থলে। অন্ধকারে উল্টে থাকা বাস, আহতদের আর্তনাদ আর বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে মুহূর্তেই তৈরি হয় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পাশের দশমিনা উপজেলা থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা ‘বাউফল ট্রাভেলস’ নামের বাসটি দ্রুতগতিতে চলছিল। আফসার গ্যারেজ এলাকায় পৌঁছানোর পর হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের খাদে পড়ে যায় বাসটি। দুর্ঘটনার তীব্রতায় বাসটির সামনের অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ঘটনাস্থলেই বাসের এক স্টাফ, যিনি সুপারভাইজার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন, প্রাণ হারান। দুর্ঘটনার ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে তার শরীরের নিচের অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, যা উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের শিহরিত করে তোলে।
বাসটিতে আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ জন যাত্রী ছিলেন বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে অন্তত ১০ জন আহত হন। স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধারকাজে এগিয়ে এসে আহতদের বাস থেকে বের করে আনেন এবং কাছাকাছি হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। আহতদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে দ্রুত শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ স্থানান্তর করা হয়েছে। অন্য আহতরা স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়েছেন।
ঘটনার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রমে অংশ নেয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। নিহত সুপারভাইজারের মরদেহ উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়েছে। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। পুলিশ জানিয়েছে, মরদেহের সুরতহাল শেষে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তা হস্তান্তর করা হবে।
দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে বিভিন্ন তথ্য সামনে আসছে। স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, এই রুটে চলাচলকারী অনেক বাসের নিচের অংশে অতিরিক্ত মালামাল বহন করা হয়, যা গাড়ির ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। তার মতে, অতিরিক্ত ওজনের কারণে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারে। একই সঙ্গে কয়েকজন যাত্রীর বরাত দিয়ে তিনি বলেন, দুর্ঘটনার সময় চালক মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন এবং বাসটির গতি ছিল অত্যন্ত বেশি। এই দুই কারণ মিলেই দুর্ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে বাউফল থানা-র ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, প্রাথমিকভাবে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে বাসটিতে ২০ থেকে ২৫ জন যাত্রী ছিলেন। তিনি বলেন, “নিহত একজন ছাড়া আরও একজন গুরুতর আহত হয়েছেন, যাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশালে পাঠানো হয়েছে। নিহতের পরিচয় এখনো জানা যায়নি। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এই দুর্ঘটনা আবারও দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। প্রায়ই দেখা যায়, অতিরিক্ত গতি, চালকের অসতর্কতা এবং গাড়ির অতিরিক্ত বোঝা বহনের কারণে এমন দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। তবুও প্রতিকারমূলক পদক্ষেপের অভাবেই যেন এসব দুর্ঘটনা বারবার ফিরে আসে।
বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং যানবাহনের নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে যাত্রীদের সচেতনতারও প্রয়োজন রয়েছে। দুর্ঘটনার আগে কোনো অনিয়ম চোখে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবাদ করা বা কর্তৃপক্ষকে জানানো অনেক ক্ষেত্রে বড় দুর্ঘটনা এড়াতে সহায়ক হতে পারে।
বাউফলের এই দুর্ঘটনায় একটি প্রাণ হারানো এবং একাধিক মানুষের আহত হওয়া কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি একটি পরিবারের জন্য চিরস্থায়ী শোকের কারণ। নিহত সুপারভাইজারের পরিবারের সদস্যরা হয়তো এখনো জানেন না, তাদের প্রিয়জন আর কখনো ফিরে আসবেন না। একইভাবে আহতদের পরিবারও উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে সময় পার করছেন।
সব মিলিয়ে, এই দুর্ঘটনা আবারও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সড়কে প্রতিটি অসতর্ক মুহূর্তই হতে পারে প্রাণঘাতী। তাই এখনই সময় সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার, যাতে আর কোনো পরিবারকে এমন নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে না হয়।