প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গ্যাস সংযোগ অনুমোদন ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ ব্যবস্থার অনুমোদন প্রক্রিয়ায় টিকে গ্রুপকে ঘিরে বড় ধরনের অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র ও নথি পর্যালোচনায় জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই ভুয়া এনওসি (নো অবজেকশন সার্টিফিকেট) ব্যবহার করে সংযোগ নেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি সামনে আসার পরও কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) কার্যকর কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন বা যাচাইাধীন বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানই আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০২১ সালের ৩১ আগস্ট জারি করা একটি পরিপত্র অনুযায়ী ১০ মেগাওয়াটের বেশি ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে হলে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করা হয়। কিন্তু টিকে গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সেই পূর্বানুমতির প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি—এমন অভিযোগ সামনে এসেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ফৌজদারহাট বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের এখতিয়ার না থাকা সত্ত্বেও সেখান থেকে একটি এনওসি ব্যবহার করা হয়, যা নিয়ে পরবর্তীতে প্রশ্ন ওঠে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, ওই নথির বৈধতা ও অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে অসঙ্গতি রয়েছে। যদিও কাগজপত্রের সত্যতা নিয়ে আলাদা মতও পাওয়া গেছে।
২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কেজিডিসিএলের ১৬৯তম বোর্ডসভায় টিকে গ্রুপের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী স্টিল মিলস লিমিটেডের জন্য ১৬.৮ মেগাওয়াট ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ গ্যাস সংযোগ অনুমোদন দেওয়া হয় বলে জানা যায়। ওই সভায় তৎকালীন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব সভাপতিত্ব করেন। পরবর্তী সময়ে এই অনুমোদন ঘিরে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এনওসি ইস্যু ও যাচাই প্রক্রিয়া। একটি পক্ষ দাবি করছে, এনওসি দেওয়ার ক্ষমতা না থাকা ব্যক্তির স্বাক্ষর ব্যবহার করে অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। এক প্রকৌশলী পরবর্তীতে গণমাধ্যমকে জানান, যে চিঠির কথা বলা হচ্ছে সেটি ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য ইস্যু করা হয়নি এবং সেটিকে এনওসি হিসেবে ব্যবহার করার কোনো ভিত্তি নেই।
পরবর্তীতে আবার তিনি ভিন্নভাবে জানান, ওই চিঠির বর্তমান কার্যকারিতা নেই এবং এটি দিয়ে গ্যাস সংযোগ নেওয়ার সুযোগ নেই। এই বক্তব্য পরিবর্তন নিয়েও প্রশাসনিক ও তদন্ত পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে টিকে গ্রুপের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা নিয়ম মেনেই আবেদন করেছে এবং স্থানীয় পর্যায়ের অফিসের নথিপত্রের ভিত্তিতেই প্রক্রিয়া এগিয়েছে। গ্রুপটির একজন জেনারেল ম্যানেজার দাবি করেন, তারা কোনো জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত নন এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রয়োজনে ক্যাপটিভ সংযোগের আবেদন করেছিলেন।
তবে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির সাবেক এক ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অতীতে তাদের কিছু নথিতে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে এবং যাচাই করলে আরও অনিয়ম সামনে আসতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তার দাবি, বিভিন্ন পর্যায়ে চাপ প্রয়োগের অভিযোগও অতীতে আলোচনায় এসেছে, যদিও এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত সিদ্ধান্ত এখনো নেই।
এদিকে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন গ্যাসের চাপ নির্ধারণ ও বিলিং সিস্টেমে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানে গ্যাসের চাপ কারসাজির মাধ্যমে বিল কম দেখিয়ে আর্থিক ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে, যা কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে দাবি করা হয়। কেজিডিসিএল পরে ওই অর্থ পুনরুদ্ধারের নির্দেশ দিয়েছে বলে জানা যায়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিকভাবে কয়েকটি অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে নথিপত্র যাচাই করা হলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তের ঘোষণা আসেনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। বরং বিষয়টি বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে চিঠি চালাচালির পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (Bangladesh Power Development Board) ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কেজিডিসিএল থেকে পাঠানো চিঠির পরও দীর্ঘ সময় কোনো কার্যকর জবাব বা সিদ্ধান্ত আসেনি। যদিও বিপিডিবি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য প্রকাশ করেনি।
অর্থনৈতিক ও জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ সংযোগ ও গ্যাস ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। এখানে স্বচ্ছতা না থাকলে শিল্প উৎপাদন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। তাদের মতে, অভিযোগ উঠলেই স্বচ্ছ তদন্ত এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি।
অন্যদিকে শিল্প খাতের একাংশের দাবি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, তাই ক্যাপটিভ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে সেই প্রক্রিয়া অবশ্যই নীতিমালার মধ্যে থেকে পরিচালিত হওয়া উচিত, যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা পক্ষপাতের সুযোগ না থাকে।
এদিকে টিকে গ্রুপের সামুদা কেমিক্যাল কমপ্লেক্সের ক্ষেত্রে গ্যাস ব্যবহারের বিলিং নিয়েও অতিরিক্ত চাপ বা কম বিলের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কয়েক বছরের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য অর্থ পরিশোধে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা পরবর্তীতে পুনরায় সমন্বয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে গ্রুপটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিষয়টি বর্তমানে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (BERC) অধীনে বিচারাধীন রয়েছে, তাই এ নিয়ে তারা বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি নন।
সব মিলিয়ে গ্যাস সংযোগ, ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ অনুমোদন এবং বিলিং ব্যবস্থাকে ঘিরে টিকে গ্রুপকে কেন্দ্র করে ওঠা অভিযোগগুলো এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি। একদিকে প্রশাসনিক নথিপত্র যাচাই, অন্যদিকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চিঠি আদান-প্রদানের মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়।
অর্থনীতি ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের অভিযোগের দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত না হলে ভবিষ্যতে শিল্প খাতের ওপর আস্থা কমে যেতে পারে এবং জ্বালানি খাতে জবাবদিহিতার প্রশ্ন আরও জোরালো হবে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং দীর্ঘদিনের এই বিতর্কের কোনো সুরাহা হয় কি না।