চট্টগ্রামে ব্যাংক শাখায় তালা, উত্তাল আমানতকারীরা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৪ মে, ২০২৬
  • ৯ বার
চট্টগ্রামে ব্যাংক শাখায় তালা, উত্তাল আমানতকারীরা

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রামে একীভূত হওয়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের আমানত ফেরত ও ‘হেয়ার কাট’ (আমানতের একটি অংশ কর্তন) বাতিলের দাবিতে দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন গ্রাহকরা। আন্দোলনের অংশ হিসেবে সোমবার (৪ মে) সকাল থেকেই নগরের আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় পাঁচটি ব্যাংকের শাখায় তালা ঝুলিয়ে দেন বিক্ষুব্ধ আমানতকারীরা।

যে পাঁচটি ব্যাংকের শাখায় তালা দেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক। এসব ব্যাংকের চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ ও আশপাশের শাখাগুলোতে গ্রাহকরা প্রবেশ বন্ধ করে দেন এবং ব্যাংকিং কার্যক্রম কার্যত অচল করে দেন।

এর আগে রবিবারও একই দাবিতে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশনের চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের ব্যানারে শত শত আমানতকারী খাতুনগঞ্জ এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেন। সেদিনও একই পাঁচ ব্যাংকের শাখায় তালা ঝুলিয়ে দেন তারা। ফলে টানা দুই দিন ধরে চট্টগ্রামে ব্যাংকিং কার্যক্রমে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

আন্দোলনকারীরা জানান, বছরের পর বছর ধরে তারা তাদের আমানত ফেরত পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন, কিন্তু বাস্তবে কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং সাম্প্রতিক সময়ে একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার পর তাদের জমানো টাকার ওপর ‘হেয়ার কাট’ আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা তাদের জন্য আরও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, সোমবার সকালে আগ্রাবাদ বাদামতলী মোড়ে গ্রাহকরা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে তারা দলে দলে বিভিন্ন ব্যাংক শাখার সামনে গিয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন। নিরাপত্তাজনিত কারণে অনেক শাখার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এবং ব্যাংক এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশনের চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সাধারণ সম্পাদক মো. আজম উদ্দীন বলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানিয়ে আসছেন, কিন্তু কোনো কার্যকর সমাধান পাননি। তিনি অভিযোগ করেন, “আমাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের ওপর হেয়ার কাট চাপিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অন্যায়।”

তিনি আরও বলেন, এটি তাদের ধারাবাহিক আন্দোলনের অংশ এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চট্টগ্রাম থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য জেলাতেও ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে তারল্য সংকট এবং আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থতার কারণে দেশের কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করে নতুন করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ গঠন করা হয়েছে। এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক এই একীভূতকরণের আওতায় এসেছে।

তবে একীভূতকরণের পরও সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরেনি। বরং অনেক গ্রাহক আশঙ্কা করছেন, তাদের সঞ্চিত অর্থ ফেরত পাওয়া আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ‘হেয়ার কাট’ নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার পর থেকেই ক্ষোভ বাড়তে থাকে।

ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং তারল্য সংকটের কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। তারা বলছেন, ব্যাংক একীভূতকরণ একটি কাঠামোগত সমাধান হতে পারে, তবে এর ফলে আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার না হলে সংকট দীর্ঘায়িত হবে।

আন্দোলনকারী গ্রাহকদের অভিযোগ, তারা বছরের পর বছর ধরে সঞ্চয় করে ব্যাংকে টাকা রেখেছেন, কিন্তু এখন সেই অর্থ ফেরত পেতে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। অনেকের দাবি, অবসরকালীন সঞ্চয়, ব্যবসার মূলধন এবং পারিবারিক নিরাপত্তার জন্য রাখা টাকা এখন ঝুঁকির মুখে।

একজন বিক্ষোভকারী বলেন, “আমরা ব্যাংকে টাকা রেখেছিলাম নিরাপত্তার জন্য, কিন্তু এখন সেই টাকাই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো সমাধান হয়নি।”

এদিকে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে এবং ধাপে ধাপে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। না হলে ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে, যা সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলবে।

চট্টগ্রামে টানা দুই দিনের এই আন্দোলন এখন শুধু ব্যাংকিং খাত নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ছোট সঞ্চয়কারীরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন। একই সঙ্গে পরবর্তী কর্মসূচি শিগগিরই ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তারা।

সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের পাঁচ ব্যাংকে চলমান এই আন্দোলন দেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে এবং আমানতকারীদের আস্থার সংকট আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত