প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে পানির স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চারটি ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে সচল রয়েছে মাত্র একটি ইউনিট, যা থেকে জাতীয় গ্রিডে সীমিত পরিমাণে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে জলসম্পদের স্বল্পতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় অনেক নিচে নেমে যাওয়ায় উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। এই কেন্দ্রের মোট পাঁচটি ইউনিট থেকে সর্বোচ্চ ২৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হলেও বর্তমানে মাত্র একটি ইউনিট সচল থাকায় উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান জানান, শুষ্ক মৌসুমে প্রতি বছরই কাপ্তাই লেকের পানির স্তর কমে যায়, তবে এবারের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাত খুবই সামান্য হওয়ায় হ্রদের পানির স্তর স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে না। ফলে একাধিক ইউনিট বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন তারা।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিয়মিত রুলকার্ভ অনুযায়ী, বছরের এই সময়ে কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর থাকার কথা ছিল ৮১.৪৩ এমএসএল (মিনস সি লেভেল)। কিন্তু সর্বশেষ সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত পানির স্তর রেকর্ড করা হয়েছে ৭৭.৯৮ এমএসএল, যা স্বাভাবিকের তুলনায় ৩.৪৫ এমএসএল কম। এই ঘাটতির কারণেই চারটি ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কন্ট্রোল রুম থেকে জানা গেছে, কেবলমাত্র ২ নম্বর ইউনিটটি সচল রয়েছে। এই ইউনিট থেকেই ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে এই উৎপাদন দেশের মোট চাহিদার তুলনায় খুবই সীমিত, ফলে জাতীয় গ্রিডে কিছুটা চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকৌশলীরা জানান, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হলে এবং কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর না বাড়লে বাকি ইউনিটগুলো পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে না। তারা আশা করছেন, আগামী দিনে বৃষ্টিপাত বাড়লে ধাপে ধাপে ইউনিটগুলো আবার উৎপাদনে ফিরতে পারবে। তবে তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আবহাওয়ার ওপর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাপ্তাই হ্রদ শুধু জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এটি দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পানির স্তর কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি স্থানীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যেও প্রভাব পড়ে।
শুষ্ক মৌসুমে কাপ্তাই হ্রদের পানি কমে যাওয়ার বিষয়টি নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই সমস্যা আরও তীব্র হচ্ছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা। তাদের মতে, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হ্রদের পানির স্বাভাবিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় জাতীয় পর্যায়ে সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে পিক আওয়ারে অতিরিক্ত চাহিদা মেটাতে বিকল্প উৎস থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে হতে পারে।
বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই কেন্দ্রটি পরিচালিত হয় Karnaphuli Hydroelectric Power Station-এর অধীনে। দীর্ঘদিন ধরেই এটি দেশের নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে কাজ করছে। তবে পানির প্রাকৃতিক প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে এর উৎপাদন ক্ষমতা প্রায়ই কমে যায়।
কেন্দ্রটির প্রকৌশলীরা বলছেন, হ্রদের পানির স্তর পুনরুদ্ধার হলে ইউনিটগুলো পর্যায়ক্রমে আবার চালু করা হবে। তবে এর জন্য পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত অত্যন্ত জরুরি। তারা আশা করছেন, বর্ষা মৌসুমের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসবে।
অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর কমে গেলে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনই নয়, নৌচলাচল, মৎস্য আহরণ এবং পর্যটন খাতেও প্রভাব পড়ে। ফলে এই সংকট স্থানীয় অর্থনীতির ওপরও পরোক্ষ চাপ তৈরি করে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যা সমাধানে কেবল বৃষ্টির ওপর নির্ভর না করে জলাধার ব্যবস্থাপনা আরও আধুনিক ও পরিকল্পিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি পানির অপচয় রোধ এবং টেকসই ব্যবস্থাপনার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
সব মিলিয়ে কাপ্তাই হ্রদের পানিসংকট আবারও দেশের বিদ্যুৎ খাতে জলসম্পদের ওপর নির্ভরশীলতার সীমাবদ্ধতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। আগামী দিনগুলোতে আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাত পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গতি স্বাভাবিক হবে কি না।