ইউনূস সরকারের বৈধতা নিয়ে রিট দাখিল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৪ মে, ২০২৬
  • ৫ বার
ইউনূস সরকারের বৈধতা নিয়ে রিট দাখিল

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গৃহীত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের সাংবিধানিক ও আইনগত বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন দাখিল করা হয়েছে। জনস্বার্থে করা এই রিটে সরকারের গঠন প্রক্রিয়া, বিভিন্ন সংস্কার কমিশন, আইন প্রণয়ন এবং দেশি-বিদেশি চুক্তির বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

রিটে শুধু সিদ্ধান্তগুলোর বৈধতাই নয়, বরং পুরো অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনার জন্য একটি স্বাধীন কমিশন গঠনেরও আবেদন জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে কি না, তা অনুসন্ধানের দাবিও জানানো হয়েছে।

রবিবার (৩ মে) সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মুহাম্মদ মুহসিন রশিদ হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এই রিটটি করেন। এতে কেবিনেট সচিব এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দুই সচিবকে বিবাদী করা হয়েছে। সোমবার (৪ মে) আইনজীবী নিজেই বিষয়টি নিশ্চিত করেন এবং জানান, এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ব্রিফিং পরে অনুষ্ঠিত হবে।

আইনজীবী মুহাম্মদ মুহসিন রশিদ এর আগেও একই ধরনের একটি রিট করেছিলেন, যেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ ও গঠন প্রক্রিয়ার বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে সেই রিট হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে খারিজ হয়ে যায়। পরে তিনি আপিল বিভাগে আবেদন করেন, যা পর্যবেক্ষণসহ খারিজ করা হয় বলে জানা যায়।

বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এর আগে ২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর এক রায়ে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন প্রক্রিয়াকে বৈধ ঘোষণা করে। ওই রায়ে বলা হয়, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হলে রাষ্ট্রপতি জরুরি প্রয়োজনে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করতে পারেন। একই সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা ও অন্যান্য উপদেষ্টাদের শপথ গ্রহণের প্রক্রিয়াও বৈধ বলে উল্লেখ করা হয়।

এই রায়ের ভিত্তিতেই পরবর্তীতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং ৬ আগস্ট সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর ৮ আগস্ট ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।

রাষ্ট্রপতির বিশেষ রেফারেন্স অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আগেই মতামত দিয়েছিল যে, জরুরি পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করতে পারেন। সেই মতামতের ভিত্তিতে শপথ গ্রহণ সম্পন্ন হয় এবং নতুন প্রশাসনিক কাঠামো কার্যকর হয়।

বর্তমান রিটে অভিযোগ করা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন নীতি, আইন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, যার অনেকগুলোই সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়গুলোও রিটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

রিটে দাবি করা হয়েছে, এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণে আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের মাধ্যমে পুরো প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা যাচাই করার আবেদন জানানো হয়েছে।

আইনজীবী মুহাম্মদ মুহসিন রশিদ গণমাধ্যমকে জানান, এটি জনস্বার্থে করা রিট এবং এর উদ্দেশ্য হলো পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সংবিধান ও আইন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় আনা জরুরি।

অন্যদিকে এই রিটকে কেন্দ্র করে আইন ও রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, এটি বিচারিক পর্যালোচনার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ, যেখানে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের সাংবিধানিক বৈধতা যাচাই করা যায়। আবার অনেকে মনে করছেন, ইতোমধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্নের অবসান ঘটেছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, একই বিষয়ে একাধিকবার রিট দাখিলের ক্ষেত্রে আদালতের পূর্ববর্তী রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কারণ উচ্চ আদালত ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন ও শপথ প্রক্রিয়াকে সাংবিধানিকভাবে বৈধ ঘোষণা করেছে।

তবে রিটে নতুন কিছু বিষয় যুক্ত করা হয়েছে, যেমন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, কমিশন গঠন এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি—যেগুলো আলাদা করে বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে বলে মত দিয়েছেন কেউ কেউ।

এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে এই ধরনের আইনি চ্যালেঞ্জ ভবিষ্যতে প্রশাসনিক নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে। তবে তারা এটাও মনে করেন, বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব প্রশ্নের সমাধান হলে রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতা আরও বাড়বে।

রিটের পরবর্তী শুনানির তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি। হাইকোর্টের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে বিষয়টির ভবিষ্যৎ গতি। আইনজীবী মহলে এই মামলা এখন নজরকাড়া আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

সব মিলিয়ে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ডের বৈধতা নিয়ে এই নতুন রিট আবারও রাজনৈতিক ও আইনগত অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে এই ইস্যুর ভবিষ্যৎ দিক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত