তাড়াহুড়ো নয়, ধৈর্যেই সাফল্যের বার্তা কোরআনে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৪ মে, ২০২৬
  • ২ বার
তাড়াহুড়ো নয়, ধৈর্যেই সাফল্যের বার্তা কোরআনে

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মানুষের স্বভাবের গভীরে যে বৈশিষ্ট্যগুলো গেঁথে আছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো তাড়াহুড়ো করার প্রবণতা। দ্রুত ফল পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, অপেক্ষা না করার মানসিকতা এবং সবকিছু তাৎক্ষণিকভাবে অর্জনের ইচ্ছা—এসবই মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্যের অংশ। এই মানবিক বাস্তবতাকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরা হয়েছে পবিত্র কোরআন-এর একটি আয়াতে, যেখানে আল্লাহ তাআলা বলেন, মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে তাড়াহুড়ার প্রবণতা দিয়ে।

সুরা আম্বিয়ার ৩৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: “خُلِقَ الۡاِنۡسَانُ مِنۡ عَجَلٍ ۚ سَاُورِیۡكُمۡ اٰیٰتِیۡ فَلَا تَسۡتَعۡجِلُوۡنِ”। এর সরল অর্থ দাঁড়ায়—মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে তাড়াহুড়াপ্রবণ হিসেবে, তবে আল্লাহ তাঁর নিদর্শনাবলী অবশ্যই দেখাবেন, তাই তাড়াহুড়া করার প্রয়োজন নেই। এই সংক্ষিপ্ত আয়াতের মধ্যেই মানব চরিত্র, ধৈর্য এবং আল্লাহর পরিকল্পনার গভীর বার্তা নিহিত রয়েছে।

ইসলামের তাফসিরগ্রন্থগুলোতে এই আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, যখন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মানুষকে আখিরাতের শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করতেন, তখন অবিশ্বাসীরা তা নিয়ে উপহাস করত। তারা বিদ্রূপ করে বলত, যদি শাস্তি সত্যিই আসে, তবে তা এখনই নেমে আসুক। এই তাড়াহুড়োর মানসিকতা এবং অবজ্ঞার জবাব হিসেবেই এই আয়াত নাজিল হয়। এখানে আল্লাহ তাআলা তাদের সতর্ক করে বলেন, তাঁর নির্ধারিত সময়েই সবকিছু ঘটবে, মানুষের তাড়াহুড়ো সেই সময়কে ত্বরান্বিত করতে পারে না।

তাফসিরে মাআরিফুল কোরআন এবং অন্যান্য ব্যাখ্যাগ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, আল্লাহ তাআলা অত্যাচারীদের তাৎক্ষণিকভাবে শাস্তি দেন না। বরং তাদের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশ দেন, যাতে তারা নিজেদের ভুল সংশোধনের সুযোগ পায়। কিন্তু যখন সেই সময় শেষ হয়, তখন শাস্তি আসে কঠোরভাবে এবং কেউ তা থেকে রক্ষা পায় না। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আয়াতটি শুধু একটি তথ্য নয়, বরং একটি সতর্কবার্তা—ধৈর্য ধারণ করো, কারণ আল্লাহর পরিকল্পনা সবসময় নির্ভুল।

মানুষের এই তাড়াহুড়োর প্রবণতা কোরআনের অন্য জায়গাতেও উল্লেখ করা হয়েছে। সুরা ইসরা’র ১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “মানুষ অত্যন্ত ত্বরাপ্রবণ।” অর্থাৎ, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বৈশিষ্ট্য নয়, বরং মানুষের মজ্জাগত একটি দুর্বলতা। আরবদের ভাষাশৈলীতে কোনো কিছুকে মানুষের স্বভাবগত বলে বোঝাতে এভাবে উপস্থাপন করা হয়।

এই আয়াতের শিক্ষা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। আমরা প্রায়ই দেখি, মানুষ খুব দ্রুত ফলাফল পেতে চায়। কোনো কাজ শুরু করার পরপরই সফলতা আশা করে, দোয়া করার সঙ্গে সঙ্গে কবুল হওয়ার প্রত্যাশা করে, কিংবা কোনো সমস্যায় পড়লে তাৎক্ষণিক সমাধান চায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জীবনের অনেক কিছুই সময়সাপেক্ষ এবং ধৈর্যের প্রয়োজন হয়।

ধৈর্য বা ‘সবর’ ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ। ধৈর্য মানে শুধু কষ্ট সহ্য করা নয়, বরং সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা। এই আয়াত আমাদের শেখায়, আল্লাহ তাআলা প্রতিটি ঘটনার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে রেখেছেন। সেই সময়ের আগে বা পরে কিছুই ঘটে না।

এখানে ‘নিদর্শন’ শব্দটির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আলেমরা বলেছেন, এটি আল্লাহর শাস্তি হতে পারে, আবার সত্যের প্রমাণও হতে পারে। অর্থাৎ, যারা অবিশ্বাস করে, তারা একসময় সত্যের প্রমাণ অবশ্যই দেখতে পাবে—চাই তা দুনিয়ায় হোক বা আখিরাতে। তাই অস্থিরতা বা সন্দেহে ভোগার কোনো সুযোগ নেই।

আধুনিক জীবনের প্রেক্ষাপটে এই আয়াতের গুরুত্ব আরও বেশি অনুভূত হয়। প্রযুক্তির যুগে মানুষ সবকিছু দ্রুত পেতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। খাবার থেকে শুরু করে তথ্য—সবকিছুই এখন হাতের মুঠোয়। ফলে ধৈর্য ধারণের ক্ষমতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। কিন্তু জীবনের বড় সাফল্যগুলো এখনো সময়, পরিশ্রম এবং ধৈর্যের ওপর নির্ভর করে।

একজন শিক্ষার্থী যখন পড়াশোনা করে, সে যদি তাৎক্ষণিক ফল আশা করে, তবে হতাশ হওয়া স্বাভাবিক। একজন কর্মজীবী মানুষ যদি দ্রুত পদোন্নতি বা সফলতা চায়, তবে তাকে অপেক্ষা করতে শিখতে হবে। একইভাবে, জীবনের সংকটময় মুহূর্তে ধৈর্য ধরে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখাই একজন মুমিনের দায়িত্ব।

এই আয়াত আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দেয়—মানুষের পরিকল্পনা সীমিত, কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনা সর্বোত্তম। আমরা অনেক সময় কোনো কিছু দেরি হচ্ছে বলে মনে করি, কিন্তু সেই দেরির মধ্যেই হয়তো আমাদের জন্য কল্যাণ লুকিয়ে আছে। তাই নিজের ইচ্ছার চেয়ে আল্লাহর সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

সবশেষে বলা যায়, তাড়াহুড়ো মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হলেও তা নিয়ন্ত্রণ করাই প্রকৃত প্রজ্ঞার পরিচয়। ধৈর্য, বিশ্বাস এবং সময়ের প্রতি শ্রদ্ধা—এই তিনটি গুণই একজন মানুষকে সফলতার পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। পবিত্র কোরআনের এই আয়াত আমাদের সেই পথই দেখায়—তাড়াহুড়ো নয়, বরং ধৈর্যের মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত সাফল্যের চাবিকাঠি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত