প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলায় কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে গবাদিপশুর খামারগুলোতে এখন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতির ব্যস্ততা। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত খামারিদের চোখেমুখে ক্লান্তি থাকলেও উৎসবের মৌসুমকে ঘিরে রয়েছে আশার আলো। একদিকে চলছে পশুর পরিচর্যা, খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা, অন্যদিকে বাজারে বিক্রির উপযোগী করে তোলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি। একইসঙ্গে অবৈধ পথে পশু প্রবেশ ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
বোচাগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় বর্তমানে নিবন্ধিত খামারির সংখ্যা ৪ হাজার ৪১২ জন। এসব খামারে কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে মোট ২৯ হাজার ৬৩০টি গবাদিপশু। এর মধ্যে গরু, ছাগল ও ভেড়া উল্লেখযোগ্যভাবে রয়েছে, যা স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অন্যান্য অঞ্চলেও সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
প্রাণিসম্পদ দপ্তর বলছে, এ বছর উপজেলায় কোরবানিযোগ্য পশুর স্থানীয় চাহিদা প্রায় ২২ হাজার ৫৩৩টি। ফলে প্রায় ৭ হাজার ৯৭টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে, যা দেশের অন্যান্য জেলা-উপজেলায় সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আবু কায়েস বিন আজিজ জানান, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে খামারগুলোতে নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। নিরাপদ মাংস উৎপাদনের স্বার্থে কোনো খামারে ক্ষতিকর স্টেরয়েড বা হরমোন ব্যবহার হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, খামারিদের সচেতন করতে নিয়মিত উঠান বৈঠক ও পরামর্শ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে, যাতে স্বাস্থ্যসম্মত পশু উৎপাদন নিশ্চিত হয় এবং ভোক্তারা নিরাপদ মাংস পান।
তিনি আরও জানান, ঈদকে ঘিরে উপজেলা পর্যায়ে ভেটেরিনারি মেডিক্যাল টিম সার্বক্ষণিক মাঠে থাকবে। কোনো পশুর স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়া হবে। একইসঙ্গে খামারি ও সাধারণ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনাও প্রদান করা হবে, যাতে পশু পরিবহন, হাটে বিক্রি এবং জবাই প্রক্রিয়া নিরাপদ থাকে।
এদিকে খামারিদের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একদিকে দীর্ঘ এক বছরের পরিশ্রমে পশু প্রস্তুত হওয়ার আনন্দ, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে শঙ্কা। খামারিরা জানান, খাদ্য, দানাদার খাদ্য ও ওষুধের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার পশু পালনে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্থানীয় খামারি আলম বলেন, তিনি এ বছর ২২টি গরু প্রস্তুত করেছেন। তবে খাদ্য ও চিকিৎসা খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতিটি পশুর পেছনে আগের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয় হয়েছে। তার আশঙ্কা, বাজারে ন্যায্য দাম না পেলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
অন্যদিকে আরেক খামারি রফিকুল ইসলাম জানান, সারা বছর পরিশ্রম করে পশু বড় করেছেন তারা। এখন যদি বাজার স্থিতিশীল থাকে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য না থাকে, তাহলে তারা কিছুটা লাভের মুখ দেখতে পারবেন। তবে পশু আমদানি ও সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পশু প্রবেশ বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
খামারিদের অভিযোগ, পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পশু আসার কারণে স্থানীয় বাজারে দাম পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এতে স্থানীয় উৎপাদিত পশুর ন্যায্য মূল্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একইসঙ্গে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পশু প্রবেশ বন্ধ না হলে স্থানীয় খামারিরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন বলেও তারা মনে করেন।
এই পরিস্থিতিতে প্রশাসন কঠোর নজরদারির আশ্বাস দিয়েছে। বোচাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. মারুফ হাসান বলেন, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে স্থানীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বাজারে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে এবং কোনো ধরনের অস্বাভাবিক প্রভাব রোধে নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা চালু থাকবে।
তিনি আরও জানান, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পশু প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। বিশেষ করে বিজিবিকে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে অবৈধ পশু প্রবেশের মাধ্যমে স্থানীয় বাজারে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়।
স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, বোচাগঞ্জের মতো একটি উপজেলায় এত বিপুল সংখ্যক কোরবানিযোগ্য পশু উৎপাদন শুধু স্থানীয় চাহিদা পূরণই নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ের সরবরাহ ব্যবস্থাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা, ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণ এবং অবৈধ বাণিজ্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।
এদিকে সাধারণ মানুষও কোরবানির পশু কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অনেকেই মনে করছেন, স্থানীয় খামারগুলোতে উৎপাদিত পশু তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাস্থ্যসম্মত এবং রোগমুক্ত। ফলে তারা স্থানীয় খামারিদের কাছ থেকেই পশু কেনার প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন।
সব মিলিয়ে বোচাগঞ্জে কোরবানির ঈদকে ঘিরে একদিকে যেমন খামারিদের ব্যস্ততা ও প্রত্যাশা বাড়ছে, অন্যদিকে বাজার নিয়ন্ত্রণ ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রশাসন, খামারি ও স্থানীয় জনগণ সবাই যদি সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে এবারের কোরবানির মৌসুম স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।