প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নতুন বেতন কাঠামো বা পে স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। সমকালসহ একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে এই নতুন পে স্কেল আংশিকভাবে কার্যকর করার মাধ্যমে প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। অর্থনৈতিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থার ভারসাম্য বিবেচনায় নিয়েই এমন ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন বাজেটে বেতন-ভাতা ও পেনশন খাতে বরাদ্দ প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হতে পারে। এই বাড়তি বরাদ্দের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে নতুন বেতন কাঠামোর মূল বেতনের অর্ধেক অংশ বাস্তবায়নের চিন্তা করা হচ্ছে। অর্থাৎ প্রথম ধাপে পূর্ণ কাঠামো নয়, বরং আংশিক সুবিধা কার্যকর করে ধীরে ধীরে পুরো স্কেল বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হবে সরকার।
সরকারি পরিকল্পনায় আরও বলা হচ্ছে, পরবর্তী দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাকি অর্ধেক মূল বেতন এবং বিভিন্ন ভাতা যুক্ত করা হতে পারে। তবে একই সঙ্গে পুরো কাঠামো দুই বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের একটি বিকল্প পরিকল্পনাও আলোচনায় রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এ নিয়ে একাধিক দফা বৈঠক হয়েছে বলে জানা গেছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আহমেদ তিতুমীরের সঙ্গে আলোচনা শেষে একটি প্রাথমিক রূপরেখা তৈরি হয়েছে।
অর্থ বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সম্প্রতি জাতীয় বেতন কমিশন, জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিশনের পূর্ববর্তী সুপারিশ পুনর্গঠনের পর নতুন করে মতামত গ্রহণ করা হয়েছে। কমিশনের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আর্থিক চাপ বিবেচনায় রেখে নতুন পে স্কেল একাধিক ধাপে বাস্তবায়ন করাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে।
প্রসঙ্গত, সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত ২৩ সদস্যের ‘জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫’ চলতি বছরের শুরুতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করে। সেই সুপারিশে সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। কমিশনের হিসাব অনুযায়ী পুরো সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে।
বর্তমানে সরকারি খাতে প্রায় ১৪ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৯ লাখের বেশি পেনশনভোগী রয়েছেন। এ খাতে সরকারের বার্ষিক ব্যয় ইতোমধ্যে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে। এমন অবস্থায় একবারে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করলে বাজেটের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এবং জাতীয় বেতন কমিশনের সদস্য ড. এ কে এনামুল হক মনে করেন, নতুন পে স্কেল একসঙ্গে কার্যকর করলে মূল্যস্ফীতির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। তার মতে, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পদ্ধতি। তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়ন যেমন জরুরি, তেমনি সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, কর আদায়ের সক্ষমতা বাড়ানো এবং কর ফাঁকি রোধ করা গেলে সরকারের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব। একই সঙ্গে যদি দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে থাকে, তাহলে নতুন বেতন কাঠামো ধীরে ধীরে বাস্তবায়নে বড় ধরনের সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
নতুন পে স্কেল শুধুমাত্র বেতন বৃদ্ধির বিষয় নয়, বরং সরকারি সেবার মান উন্নয়ন এবং সুশাসন নিশ্চিত করার একটি উদ্যোগ বলেও মনে করেন তিনি। তার মতে, একজন কর্মচারী যদি ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে না পারেন, তাহলে তার কাছ থেকে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা প্রত্যাশা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে দারিদ্র্যজনিত চাপ কমিয়ে কর্মপরিবেশ উন্নত করাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
কমিশনের প্রতিবেদনে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্য বীমা চালু, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার, ভাতা কাঠামোর পুনর্বিন্যাস এবং বিভিন্ন গ্রেডে বেতন সমন্বয়ের সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য মাসিক ভাতা, টিফিন ভাতা বৃদ্ধি এবং বৈশাখী ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বর্তমান টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশও করা হয়েছে, যা সরকারি কর্মচারীদের সামাজিক ও আর্থিক সুরক্ষা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে পেনশন ব্যবস্থায়ও বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশনভোগীদের জন্য ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি, ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে থাকা পেনশনভোগীদের জন্য ৭৫ শতাংশ এবং তার বেশি আয়ের পেনশনভোগীদের জন্য ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের পরিচালন ব্যয় ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের তুলনায় পরিচালন ব্যয় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বেশি ছিল, ফলে সরকারকে ঋণ নির্ভরতা বাড়াতে হয়েছে। তবে নতুন বেতন কাঠামো চালু হলে কর ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং আয়করের আওতা বাড়ার মাধ্যমে রাজস্ব আয়ও বাড়তে পারে বলে তারা মনে করছেন।
বর্তমানে বিদ্যমান পে স্কেল ২০১৫ সালের। এরপর থেকে কয়েক দফা বিশেষ সুবিধা ও বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বাড়ানো হলেও পূর্ণাঙ্গ বেতন কাঠামো সংস্কার হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে নতুন পে স্কেল নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে প্রত্যাশা ও আলোচনা চলছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাজেট ভারসাম্য রক্ষা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। তবে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হলে অর্থনীতির ওপর চাপ কিছুটা কমবে এবং একই সঙ্গে কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়নও সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের এই ধাপে ধাপে পরিকল্পনা সরকারি কর্মচারী ও সামগ্রিক অর্থনীতির মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা। এখন সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক অনুমোদনের ওপরই নির্ভর করছে এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বেতন কাঠামোর বাস্তবায়নের ভবিষ্যৎ।