ইস্টার্ন রিফাইনারি চালু, স্বস্তি জ্বালানি খাতে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৬ মে, ২০২৬
  • ৪০ বার
ইস্টার্ন রিফাইনারি চালু, স্বস্তি জ্বালানি খাতে

প্রকাশ:  ৬ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে স্বস্তির বার্তা নিয়ে অবশেষে পুনরায় চালু হতে যাচ্ছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি। দীর্ঘ ২২ দিন বন্ধ থাকার পর নতুন করে কাঁচামাল বা অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ায় আগামী ৭ মে থেকে পূর্ণোদ্যমে উৎপাদনে ফিরতে পারে এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এবার আমদানির ক্ষেত্রে ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, যা ইতোমধ্যেই কার্যকর ফল দিতে শুরু করেছে।

মঙ্গলবার গভীর রাতে ‘এমটি নাইনমিয়া’ নামের একটি ট্যাংকার এক লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল নিয়ে বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করেছে। জাহাজটি বর্তমানে কক্সবাজারের কুতুবদিয়া পয়েন্টে নোঙর করে রয়েছে এবং সেখান থেকেই শুরু হয়েছে তেল খালাসের প্রাথমিক কার্যক্রম। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তেল শোধনাগারের উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।

এবারের তেল আমদানির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হরমুজ প্রণালীর ঝুঁকি এড়িয়ে বিকল্প রুট ব্যবহার করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালী বর্তমানে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলবর্তী ইয়ানবু বন্দরকে বেছে নেয়। বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের ভাড়া করা ট্যাংকারটি গত ২০ এপ্রিল ইয়ানবু বন্দরে পৌঁছে এবং পরদিন চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে।

বিএসসি-র ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক জানিয়েছেন, এই চালানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ, যা ভবিষ্যতে জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে নতুন দিকনির্দেশনা তৈরি করতে পারে। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ঝুঁকি এড়াতে বিকল্প রুট ব্যবহারই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত ছিল।

কুতুবদিয়া পয়েন্টে পৌঁছানোর পর বিপিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তেলের মান যাচাই করেন এবং প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। এরপর শুরু হয় ‘লাইটারিং’ পদ্ধতিতে তেল স্থানান্তরের কাজ, যেখানে বড় ট্যাংকার থেকে ছোট লাইটার জাহাজে তেল সরিয়ে আনা হয়। মোট আটটি লাইটার জাহাজের মাধ্যমে এই তেল চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকার ডলফিন জেটিতে পৌঁছানো হবে। সেখান থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল সরাসরি ইস্টার্ন রিফাইনারির সংরক্ষণাগারে নেওয়া হবে।

এর আগে পর্যাপ্ত ক্রুড অয়েলের অভাবে গত ১৪ এপ্রিল ইস্টার্ন রিফাইনারির তিনটি ইউনিটের মধ্যে দুটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এই দুটি ইউনিটে প্রতিদিন চার হাজার মেট্রিক টনের বেশি বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল উৎপাদিত হতো, যার মধ্যে অকটেন, পেট্রোল, ডিজেল এবং ফার্নেস অয়েল উল্লেখযোগ্য। ইউনিট দুটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয় এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে বিপিসিকে সরাসরি পরিশোধিত তেল আমদানির পথে যেতে হয়।

বর্তমানে আসা এক লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই চালান থেকে প্রায় ২৬ হাজার টন ডিজেল, ২৪ হাজার টন ফার্নেস অয়েল, ১৬ হাজার টন পেট্রোল, ২১ হাজার টন কেরোসিন এবং ৮ হাজার টন অকটেন উৎপাদন সম্ভব হবে। এতে দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিচ্ছেন, এই এক লাখ টন ক্রুড অয়েল দীর্ঘমেয়াদে যথেষ্ট নয়। ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম বলেন, এই পরিমাণ তেল দিয়ে সর্বোচ্চ ২৫ দিন শোধনাগার চালানো সম্ভব হবে। তাই এর মধ্যেই পরবর্তী চালানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

এই প্রেক্ষাপটে আশার খবর হলো, ইতোমধ্যেই আরেকটি বড় চালানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর থেকে আগামী ১০ মে আরও এক লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল লোড হওয়ার কথা রয়েছে। এই চালানটিও একইভাবে ঝুঁকিপূর্ণ গালফ অঞ্চল এড়িয়ে বিকল্প রুট ব্যবহার করে আনা হবে এবং ২৫ মে নাগাদ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

বিএসসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই নতুন কৌশলের ফলে ইরান যুদ্ধ বা গালফ অঞ্চলের অস্থিরতার কোনো সরাসরি প্রভাব পড়বে না। ফলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের বিকল্প রুট ব্যবহার করে জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা নেওয়া হতে পারে।

রিফাইনারির কার্যক্রম আংশিকভাবে বন্ধ থাকলেও তৃতীয় ইউনিটটি চালু ছিল, যেখানে সীমিত আকারে বিটুমিন, পেট্রোল এবং অকটেন উৎপাদন অব্যাহত রাখা হয়েছিল। তবে পূর্ণ উৎপাদন না থাকায় বাজারে সরবরাহের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, যা পূরণ করতে বিপিসিকে অতিরিক্ত খরচে বিদেশ থেকে পরিশোধিত তেল আমদানি করতে হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইস্টার্ন রিফাইনারির পুনরায় চালু হওয়া শুধু জ্বালানি সরবরাহের দিক থেকেই নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিজস্ব শোধনাগারে তেল পরিশোধন করলে ব্যয় তুলনামূলক কম হয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও হ্রাস পায়। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ধরনের কৌশলগত পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও বাংলাদেশ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিয়েছে। ইস্টার্ন রিফাইনারির পুনরায় চালু হওয়া সেই প্রচেষ্টারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা দেশের জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত