প্রকাশ: ৬ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাত এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক বাজারে শক্ত অবস্থান ধরে রাখা এই খাত এখন ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার সংকেত দিচ্ছে। বিশেষ করে ম্যানমেইড ফাইবার বা কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক উৎপাদনে পিছিয়ে থাকা এবং নীতিগত জটিলতা—এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবে কমছে রফতানির গতি, যা অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক বার্তা বহন করছে।
বিশ্বের তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ অবস্থানে থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই অবস্থানে ধাক্কা লেগেছে। World Trade Organization-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে বৈশ্বিক পোশাক বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব কমেছে। একই সময় কিছুটা পিছিয়েছে China-ও। বিপরীতে বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে Vietnam, যা এখন তৃতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশ হিসেবে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের মূল কারণগুলোর একটি হলো বৈশ্বিক ফ্যাশন প্রবণতার রূপান্তর। একসময় যেখানে সুতির পোশাকের চাহিদা বেশি ছিল, এখন সেখানে আধিপত্য বিস্তার করছে পলিয়েস্টার, নাইলন ও ভিসকোসের মতো কৃত্রিম তন্তু। আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য স্পোর্টসওয়্যার, অ্যাথলিজার এবং আউটডোর পোশাকের জনপ্রিয়তা বেড়েছে, যেগুলোর বেশিরভাগই তৈরি হয় ম্যানমেইড ফাইবার দিয়ে। এই পরিবর্তিত বাজারে দ্রুত সাড়া দিতে পারলেও পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ।
দেশের তৈরি পোশাক খাতের অন্যতম সংগঠন Bangladesh Knitwear Manufacturers and Exporters Association-এর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জানান, ম্যানমেইড ফাইবারের বাজার দিন দিন প্রসারিত হচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশ সেই বাজারে যথাযথভাবে প্রবেশ করতে পারছে না। তার মতে, এই খাতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে নানামুখী বাধা উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং নীতিগত অসঙ্গতির কারণে নতুন পণ্যে বিনিয়োগ করা কঠিন হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে National Board of Revenue-এর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অসহযোগিতা, জটিল আমদানি নীতি এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার উদ্যোক্তাদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ফলে অনেকেই নতুন প্রযুক্তি বা পণ্যে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
এই পরিস্থিতি শুধু ব্যবসার জন্য নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের মোট রফতানির সিংহভাগ যোগান দেয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। এই খাত দুর্বল হয়ে পড়লে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা চাপের মুখে পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। Policy Exchange Bangladesh-এর চেয়ারম্যান মাশরুর রিয়াজ বলেন, রফতানিকারকদের উৎপাদন খরচ কোথায় বাড়ছে, কোথায় তারা সমস্যায় পড়ছেন—এসব বিষয় নিয়ে সরকার ও উদ্যোক্তাদের যৌথভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে জ্বালানি সংকট, লজিস্টিক ব্যয় এবং নীতিগত জটিলতা দূর না করলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।
বর্তমান বৈশ্বিক বাজারে Vietnam যে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে কৌশলগত পরিকল্পনা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। দেশটি আগেভাগেই ম্যানমেইড ফাইবারভিত্তিক পোশাক উৎপাদনে জোর দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় বাজারেও তারা শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ এখনও মূলত সুতিনির্ভর পোশাক উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। যদিও সুতির পোশাক পরিবেশবান্ধব, তবে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি পুনর্ব্যবহারযোগ্য পলিয়েস্টারের মতো কৃত্রিম তন্তুও এখন পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে ভবিষ্যতে বাজার হারানোর ঝুঁকি আরও বাড়বে।
চলতি বছরের শুরুতেও সেই প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানির ক্ষেত্রে Vietnam এগিয়ে থাকছে, যেখানে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে কম। এই ব্যবধান দিন দিন বাড়তে থাকলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এই সংকটের মধ্যেও সম্ভাবনার আলো রয়েছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত ইতোমধ্যেই বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী উৎপাদনভিত্তি তৈরি করেছে। দক্ষ শ্রমশক্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিতি—এইসব সুবিধা কাজে লাগিয়ে নতুন কৌশল গ্রহণ করলে আবারও ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন সময় এসেছে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণের। ম্যানমেইড ফাইবার খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, প্রযুক্তি উন্নয়ন, নীতিগত সংস্কার এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা—এই চারটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোও জরুরি।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে এই খাতের অর্জিত সাফল্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। তবে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া গেলে আবারও প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে—যা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।