আদালতে চাঞ্চল্যকর দাবি, দোষ চাপালেন ‘ডলার’-এর ওপর

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১ জুন, ২০২৬
  • ৩০ বার

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মম হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে যে ক্ষোভ, শোক ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে, তার মধ্যেই আদালতে দাঁড়িয়ে আলোচিত মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানার দেওয়া বক্তব্য নতুন করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চার্জগঠন শুনানির দিন সাংবাদিকদের সামনে তিনি ধর্ষণের দায় স্বীকারের ইঙ্গিত দিলেও হত্যাকাণ্ডের দায় নিজের ওপর না নিয়ে ‘ডলার’ নামের এক ব্যক্তির দিকে অভিযোগের আঙুল তোলেন। একই সঙ্গে স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে নির্দোষ দাবি করেন তিনি।

সোমবার (১ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে মামলার চার্জগঠন শুনানিকে কেন্দ্র করে আদালত এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সকালে দুই আসামিকে পৃথক কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়। প্রধান আসামি সোহেল রানাকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে এবং সহ-আসামি স্বপ্না আক্তারকে কাশিমপুর কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়।

বেলা ১১টার কিছু পরে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে তাদের তোলা হলে উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন সোহেল রানা। এ সময় তিনি বলেন, “আমি একা দোষী না। আমার স্ত্রীর কোনো দোষ নেই। সব দোষ ডলারের। আমি শুধু ধর্ষণ করছি, মারছে ডলার।”

আদালত প্রাঙ্গণে দেওয়া তার এই বক্তব্য মুহূর্তেই উপস্থিতদের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। আরও বিস্ময়করভাবে তিনি দাবি করেন, ডলার নামের ওই ব্যক্তি তাকে দুই লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলেছিল। যদিও এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো তথ্য উপস্থাপন করতে পারেননি। সাংবাদিকরা ডলার নামের ব্যক্তির পরিচয় জানতে চাইলে সোহেল রানা বলেন, তিনি মিরপুর ১১ নম্বর এলাকার একজন বিত্তশালী ব্যক্তি।

এ সময় তিনি তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করেন। তার দাবি, ডিএনএ পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ ফলাফল বিবেচনা না করেই তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিষয় লিখিত হয়েছে। তবে তদন্তকারী সংস্থা কিংবা আদালতের পক্ষ থেকে তার এই দাবির বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

এদিকে মামলার তদন্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্তের বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের পরই অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। গত ২৪ মে পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আহিদুজ্জামান ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। অন্যদিকে স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতা করার অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে জানান, মামলায় মোট ১৮ জন সাক্ষী রয়েছেন, যাদের সাক্ষ্য ও অন্যান্য আলামত তদন্ত প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার পর মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। আদালত চার্জগঠন শুনানির জন্য ১ জুন তারিখ নির্ধারণ করেছিলেন। এর মধ্য দিয়ে মামলার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। তদন্ত, আলামত সংগ্রহ, ডিএনএ পরীক্ষা, অভিযোগপত্র দাখিল এবং আদালতে তা গ্রহণ—সব মিলিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়া এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু বলেন, মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য রাষ্ট্রপক্ষ দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে। তবে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং পরবর্তী সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়।

এদিকে দ্রুত বিচার এবং রায় কার্যকরের বিষয়টি নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, আলোচিত মামলাগুলোর ক্ষেত্রে নিম্ন আদালতে দ্রুত বিচার সম্ভব হলেও চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে উচ্চ আদালতের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করতে হয়। ফলে রায় ঘোষণার পরও কার্যকর হতে দীর্ঘ সময় লেগে যাওয়ার নজির রয়েছে।

ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইডের আইনজীবী রায়হানা নাজনীন জুই বলেন, মামলার বর্তমান অগ্রগতি দেখে দ্রুত বিচার সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বিচার শেষ হওয়াই শেষ কথা নয়। রায় কার্যকর করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিচারিক ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কোনো মামলার চূড়ান্ত পরিণতি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

মামলার এজাহার ও তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ মে সকালে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা আক্তার নিজ বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘ সময় খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় একটি ফ্ল্যাটে সন্দেহজনক পরিস্থিতি লক্ষ্য করা হয়।

পরে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে সেখানে শিশু রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই বাসার বাথরুমে একটি বালতির ভেতর থেকে তার বিচ্ছিন্ন মাথা পাওয়া যায়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর পুরো দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহলে শিশু নিরাপত্তা এবং নারী-শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি ওঠে।

ঘটনার পর প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা পালিয়ে গেলেও পরে নারায়ণগঞ্জ এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরবর্তীতে আদালতে তিনি এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বর্তমানে উভয় আসামি কারাগারে রয়েছেন।

শিশু রামিসার মর্মান্তিক মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে দেয়নি, নাড়িয়ে দিয়েছে পুরো দেশকে। আদালতে সোহেল রানার নতুন দাবি বিচারিক প্রক্রিয়ায় কী প্রভাব ফেলবে, সেটি এখন দেখার বিষয়। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো আসামির আদালত প্রাঙ্গণে দেওয়া বক্তব্যের চেয়ে তদন্তে পাওয়া তথ্য-প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং ফরেনসিক বিশ্লেষণই শেষ পর্যন্ত মামলার বিচারিক সিদ্ধান্ত নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

এখন দেশের মানুষের নজর আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমের দিকে। ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় রামিসার পরিবার যেমন অপেক্ষা করছে, তেমনি পুরো দেশও এই আলোচিত মামলার বিচারিক অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত