প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘদিন ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ডামাডোলে পুরো বিশ্ব আজ এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। রক্তক্ষয়ী এই সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে ইউরোপ তথা বিশ্বে শান্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে এবার এক নতুন ও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে ইউরোপের তিন শক্তিশালী দেশ—যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং জার্মানি। লন্ডনের ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির উপস্থিতিতে এই তিন দেশের নেতারা রাশিয়াকে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট শর্ত প্রদান করেছেন। ‘ই-৩’ নামে পরিচিত এই শক্তিশালী ইউরোপীয় জোটের এই ঘোষণা রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটের ইতিহাসে এক নতুন বাঁক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বৈঠকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ অত্যন্ত গম্ভীর আলোচনায় অংশ নেন। এই আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল একটি ‘ন্যায়সংগত ও দীর্ঘস্থায়ী’ শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বরাবরই তার আগ্রাসী অবস্থান অটল রেখেছেন, যা বিশ্বনেতাদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটেই ই৩ জোট রাশিয়াকে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতিসহ মোট পাঁচটি শর্ত মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের এই অবস্থান স্পষ্ট যে, ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব এবং ইউরোপের সামগ্রিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে কোনো চুক্তি বা শান্তি সম্ভব নয়।
শর্তগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, রাশিয়াকে অবিলম্বে এবং শর্তহীনভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে হবে। যুদ্ধক্ষেত্রের বর্তমান ফ্রন্টলাইন বা অবস্থানকে আলোচনার শুরুর বিন্দু হিসেবে গ্রহণ করার প্রস্তাব দিয়েছে ই৩ জোট। তবে তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পরিবর্তনের যেকোনো প্রচেষ্টা অবৈধ এবং তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এর অর্থ হলো, রাশিয়া বর্তমানে যে ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, তা আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতেই ফয়সালা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইউক্রেনের জন্য একটি শক্তিশালী এবং আইনিভাবে বাধ্যকর নিরাপত্তা গ্যারান্টি নিশ্চিত করতে হবে। এর অধীনে ইউক্রেনের মাটিতে ‘মাল্টিন্যাশনাল ফোর্স-ইউক্রেন’ মোতায়েনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে যেকোনো আগ্রাসন ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
তৃতীয়ত, রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও আইনি চাপ বজায় রাখার বিষয়ে ইউরোপীয় নেতারা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। রাশিয়া যতক্ষণ না তার আগ্রাসন সম্পূর্ণ বন্ধ করছে এবং যুদ্ধের ফলে ইউক্রেনের যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত রাশিয়ার জব্দকৃত সম্পদ অবরুদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি রাশিয়ার অর্থনীতির ওপর এক বিশাল আঘাত, যা তাদের যুদ্ধের খরচ মেটানো কঠিন করে তুলবে। চতুর্থ শর্ত হিসেবে ইউরোপের সামগ্রিক নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। যেকোনো চুক্তিতে এটি নিশ্চিত করতে হবে যে তা কেবল ইউক্রেন বা রাশিয়ার জন্য নয়, বরং পুরো ইউরোপের শান্তিরক্ষায় যেন সহায়ক হয়। পঞ্চম এবং সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হলো, ন্যাটো জোটে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ইউক্রেনের যে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে, তাকে পূর্ণ সম্মান জানাতে হবে। পুতিন দীর্ঘদিন ধরে ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগদানের বিরোধিতা করে আসছেন, কিন্তু ইউরোপীয় নেতারা তার এই দাবিকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন।
এই বৈঠকে জেলেনস্কির সরাসরি আলোচনার আহ্বানের প্রশংসা করেছেন ইউরোপীয় নেতারা। প্রেসিডেন্ট পুতিনের কাছে পাঠানো জেলেনস্কির খোলা চিঠিতে যুদ্ধ বন্ধের যে আন্তরিক আবেদন ছিল, তা রাশিয়া প্রত্যাখ্যান করলেও ই৩ জোট তার পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। তবে পুতিনের পক্ষ থেকে বার্তা এসেছে, রাশিয়ার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তারা থামবে না। এই বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণেই শান্তি আলোচনার পথ এখনো কন্টকাকীর্ণ। বৈঠকে এটিও উঠে এসেছে যে, এই শান্তি প্রক্রিয়ায় ইউরোপের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। তবে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনোযোগ বর্তমানে ইরান যুদ্ধের দিকে স্থানান্তরিত হওয়ায় ইউরোপীয় নেতারা কিছুটা উদ্বিগ্ন। তারা মনে করছেন, ইউক্রেন সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা কমলে রাশিয়া আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ধরে রাখার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
লন্ডনের এই বৈঠকটি কেবল একটি কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল না, বরং এটি ছিল ইউক্রেনের জনগণের জন্য এক বিশাল নৈতিক সমর্থন। যুদ্ধের এই দীর্ঘ সময়ে যখন অনেক দেশই পিছু হটতে শুরু করেছে, তখন যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির এই কঠোর শর্তাবলি ইউক্রেনের মনোবল বাড়িয়ে দিয়েছে। সাধারণ ইউক্রেনীয়রা যারা প্রতিদিন সাইরেনের শব্দের মধ্যে দিন পার করছেন, তাদের জন্য এই পাঁচটি শর্ত একটি আলোর দিশারি। তবে শান্তি প্রতিষ্ঠা কেবল শর্তের ওপর নির্ভর করে না, এর জন্য প্রয়োজন উভয় পক্ষের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। রাশিয়া যদি এই শর্তগুলো মেনে না নেয়, তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাশিয়া আরও বেশি একঘরে হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইউরোপের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পেছনে এই যুদ্ধ একটি প্রধান কারণ। জ্বালানি সংকট, খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং মুদ্রাস্ফীতির মতো বৈশ্বিক সমস্যাগুলো এই যুদ্ধের কারণেই প্রকট হয়েছে। ই৩ জোটের এই পদক্ষেপ যদি সফল হয়, তবে কেবল ইউক্রেন নয়, বরং পুরো বিশ্বের অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরে আসবে। এখন দেখার বিষয়, রাশিয়া এই শর্তগুলোকে কীভাবে গ্রহণ করে এবং পুতিন কি আদৌ আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন কি না। কূটনৈতিক নানা মোড় এবং ভূ-রাজনীতির জটিল এই গোলকধাঁধায় শান্তি প্রতিষ্ঠার এই প্রচেষ্টা ইতিহাসের পাতায় কতটুকু সফল হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে ই৩ জোটের আজকের এই দৃঢ় অবস্থান এটাই প্রমাণ করে যে, ইউরোপ ইউক্রেনের পাশে অটলভাবে দাঁড়িয়ে আছে এবং ন্যায়বিচারের পথ থেকে তারা সরবে না।