তারেক-শি বৈঠকে সম্পর্কের নতুন দিগন্ত

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬
  • ৩৭ বার

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে বেইজিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং। শুক্রবার (২৬ জুন) সকালে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অনুষ্ঠিত এই বৈঠককে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। উন্নয়ন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে উভয় নেতা বিস্তৃত আলোচনা করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় চীন সফরকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন মেগা প্রকল্প, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিল্প খাতে চীনের অংশগ্রহণ ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। ফলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন পূর্বেই জানিয়েছিলেন যে, বৈঠকে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হবে। বিশেষ করে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি স্থানান্তর, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উন্নয়ন প্রকল্পে সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হবে। বৈঠকে এসব বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে জোর দিচ্ছে। চীন এ ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, কৃষিপণ্য, চামড়া ও ওষুধ শিল্পের জন্য চীনা বাজারে প্রবেশাধিকার আরও বিস্তৃত হলে দেশের রপ্তানি আয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে শিল্পাঞ্চল, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং প্রযুক্তিনির্ভর খাতে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বৈঠকের আগে মাহদী আমিন বলেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক বহুমাত্রিক ক্ষেত্রে আরও গভীর হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, কৌশলগত সহযোগিতা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন প্রকল্প এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগের ক্ষেত্রেও নতুন অগ্রগতি দেখা যাবে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ঢাকা ও বেইজিং উভয়ই দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে আগ্রহী।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর শুরু হয়েছিল গত ২১ জুন মালয়েশিয়া সফরের মাধ্যমে। পরবর্তীতে তিনি বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে চীনের দালিয়ান শহরে যান। সেখানে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী, নীতিনির্ধারক এবং বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক ও মতবিনিময় করেন। বৈশ্বিক অর্থনীতি, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত রূপান্তর নিয়ে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন অধিবেশনে বাংলাদেশের সম্ভাবনা তুলে ধরেন তিনি। দালিয়ানের কর্মসূচি শেষ করে গত বুধবার বেইজিংয়ে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী।

চীন সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রয়েছে ২৪ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। প্রতিনিধিদলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা রয়েছেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর পাঁচজন উপদেষ্টাও সফরসঙ্গী হিসেবে অংশ নিয়েছেন। তাঁদের উপস্থিতি ইঙ্গিত করছে যে, সফরটি বহুমাত্রিক সহযোগিতার নানা ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর থেকে ধীরে ধীরে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবকাঠামো উন্নয়ন, সেতু নির্মাণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, বন্দর উন্নয়ন এবং যোগাযোগ খাতে চীনের সম্পৃক্ততা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি এবং পর্যটন খাতেও সহযোগিতা সম্প্রসারিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বিশ্বে ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সম্পর্ক নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং ক্রমবর্ধমান বাজারের কারণে চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচিত। অন্যদিকে বাংলাদেশও অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে চীনের সহযোগিতাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।

সফরের শেষ দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি রয়েছে। এর মধ্যে চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে বৈঠক এবং চীনের জাতীয় জাদুঘর পরিদর্শন উল্লেখযোগ্য। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব বৈঠক দুই দেশের পার্লামেন্টারি এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও জোরদারে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

বেইজিং সফর শেষে শুক্রবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। সফর শেষে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা এবং সম্ভাব্য সমঝোতা বা সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ পেতে পারে। তবে ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের এই বৈঠক দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গভীর ও ফলপ্রসূ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ যখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের নতুন লক্ষ্য সামনে রেখে এগিয়ে যাচ্ছে তখন চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা দেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় নতুন গতি যোগ করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শুধু একটি কূটনৈতিক ঘটনা নয় বরং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com