হোটেলের ১২ লাখ টাকা বকেয়া রেখে উধাও এনসিপি নেতারা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৬ বার
হোটেলের ১২ লাখ টাকা বকেয়া রেখে উধাও এনসিপি নেতারা

প্রকাশ: ৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজনীতি সেবার মাধ্যম, কিন্তু রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার সদস্য সচিব প্রকৌশলী এস এম শাহরিয়ারসহ পাঁচ নেতার বিরুদ্ধে ১২ লাখ টাকার হোটেল বিল বকেয়া রেখে গা ঢাকা দেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। শুধু অর্থ আত্মসাৎ নয়, বরং হোটেলের কক্ষে অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার মতো গুরুতর অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে এনেছে হোটেল কর্তৃপক্ষ। প্রায় আট মাস ধরে চলা এই ঘটনাপ্রবাহ এখন স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি করেছে।

ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের ২৫ জুলাই। রাজধানীর শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণিতে অবস্থিত হোটেল ইয়ামেনী ইন্টারন্যাশনালে মাত্র দশ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়ে দুটি কক্ষ বুকিং করেছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ এনসিপির সদস্য সচিব প্রকৌশলী এস এম শাহরিয়ার। শুরুর দিকে এটি সাধারণ ব্যবসায়িক লেনদেনের মতো মনে হলেও, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে আসতে শুরু করে তাদের আসল উদ্দেশ্য। পরবর্তী প্রায় আট মাস ধরে ওই দুটি কক্ষে শুধু শাহরিয়ারই নন, বরং তার দলের কয়েক ডজন নেতাকর্মী নিয়মিত আনাগোনা করতেন। হোটেল কর্তৃপক্ষের দাবি, আট মাসের দীর্ঘ সময়ে তাদের পাওনা অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ টাকায়। কিন্তু ভাড়ার টাকা পরিশোধের পরিবর্তে অভিযুক্তরা নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন।

হোটেল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, এই রাজনৈতিক নেতারা শুধু যে অর্থ পরিশোধে গড়িমসি করেছেন তা-ই নয়, বরং হোটেলের পবিত্র পরিবেশ নষ্ট করার মতো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন। সিসিটিভি ফুটেজে এমন কিছু দৃশ্য ধরা পড়েছে যা নিয়ে রীতিমতো তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ৩১ ডিসেম্বর সকালের দিকে দলের নেতাদের ব্যবহৃত ৭২৪ নম্বর কক্ষে একজন তরুণীর প্রবেশ ও বিকেলে তার বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্য সিসি ক্যামেরায় রেকর্ড হয়েছে। হোটেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেদিন ওই কক্ষে এমন কিছু অনৈতিক ঘটনা ঘটেছিল যার জের ধরে পরবর্তীতে পুলিশ পর্যন্ত হোটেলের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়েছিল। হোটেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খন্দকার রুহুল আমিন অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানান, তারা প্রথম দিকে এই নেতাদের দলের পরিচয়ের কারণে এবং তাদের বয়সের কথা বিবেচনা করে অনেক ছাড় দিয়েছিলেন, কিন্তু অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।

অর্থ উদ্ধারের আশায় বারবার যোগাযোগ করা হলেও অভিযুক্তরা উল্টো রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দলের পরিচয় ব্যবহার করে হুমকি-ধমকি দেওয়ার ফলে হোটেল কর্তৃপক্ষ অসহায় বোধ করছিল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি রাতের অন্ধকারে সমস্ত পাওনা অনাদায়ী রেখেই হোটেলের কক্ষ ত্যাগ করেন ওই নেতারা। ফেলে রেখে যান তাদের ব্যবহৃত কাপড়-চোপড় এবং বকেয়া বিলের বোঝা। এই ঘটনায় নিঃস্ব হোটেল কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে এনসিপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছে। অভিযুক্ত পাঁচজনের তালিকায় এস এম শাহরিয়ার ছাড়াও রয়েছেন সাংগঠনিক সম্পাদক সাদেক মির্জা, যাত্রাবাড়ী থানার প্রধান সমন্বয়কারী মিরাসাত হোসেন হিমেল, শাখাওয়াত হোসেন এবং তাওসীপ।

একজন রাজনৈতিক কর্মীর কাছ থেকে এমন আচরণের প্রত্যাশা সাধারণ মানুষ করে না। রাজনীতির নামে হোটেলে আস্তানা গেড়ে এবং দীর্ঘ আট মাস ধরে সাধারণ ব্যবসায়ীর পাওনা অর্থ আত্মসাৎ করার ঘটনা সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে যখন দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা এই ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন, তখন পুরো রাজনৈতিক সংগঠনের ভাবমূর্তিই জনসমক্ষে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচনের অস্থিরতাকে পুঁজি করে তারা তাদের অবস্থান নিশ্চিত করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন এবং নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপরই সটকে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আতিক মুজাহিদ পুরো ঘটনায় তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, বিষয়টি জানামাত্রই দলের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আতিক মুজাহিদ দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারণ করেন যে, তদন্তে যদি তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে এস এম শাহরিয়ারসহ অভিযুক্ত প্রত্যেককে দলীয়ভাবে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে। তিনি আরও বলেন, জাতীয় নাগরিক পার্টিতে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কোনো জায়গা নেই এবং দলের কোনো নেতা বা কর্মীর ব্যক্তিগত অপকর্মের দায় দল বহন করবে না।

রাজনীতি যখন ব্যক্তিস্বার্থ আর অনৈতিকতার গোলকধাঁধায় হারিয়ে যায়, তখন তার ভুক্তভোগী হতে হয় সাধারণ মানুষকে। এই ঘটনায় হোটেল ইয়ামেনী ইন্টারন্যাশনাল যেমন আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছে, তেমনি এনসিপির মতো রাজনৈতিক সংগঠনের আদর্শও আজ বিচারের মুখোমুখি। এখন দেখার বিষয়, দল গঠিত তদন্ত কমিটি এই ঘটনায় কতটা স্বচ্ছতা ও কঠোরতার সঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণ করে। অভিযুক্তরা যদি রাজনৈতিক পরিচয়ে পার পেয়ে যান, তবে তা ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।

একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। অর্থ পরিশোধ না করা এবং হোটেলের মতো পাবলিক প্লেসে অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার মতো ঘটনা যদি রাজনৈতিক ছায়াতলে ঢাকা পড়ে যায়, তবে রাজনীতির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও শ্রদ্ধা দ্রুতই হ্রাস পাবে। দেশবাসী এখন তাকিয়ে আছে ওই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের দিকে। কেবল বহিষ্কারই যথেষ্ট নয়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করাও জরুরি যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো রাজনৈতিক নেতা হোটেলের বিল বকেয়া রেখে পালিয়ে যাওয়ার মতো জঘন্য কাজ করার সাহস না পান।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com