প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বের এক নম্বর প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপলের একচেটিয়া আধিপত্যের দেওয়ালে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে ইউরোপে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজরদারি ও একচেটিয়া প্রভাব কমানোর কঠোর আইনের বিরুদ্ধে করা এক আইনি লড়াইয়ে হেরে গেছে অ্যাপল। বুধবার লুক্সেমবার্গভিত্তিক ইইউর জেনারেল কোর্ট বহুল আলোচিত এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। একই দিন আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি বিশ্ববাসীর সামনে নিয়ে আসে। এই রায়ের মাধ্যমে বিশ্ব বাজারে অ্যাপলের একচ্ছত্র বাণিজ্যিক আধিপত্য এবং তাদের নিজস্ব আইওএস অপারেটিং সিস্টেমের কঠোর নিয়মকানুন বড় ধরনের আইনি বাধ্যবাধকতার মুখে পড়ল।
আদালতের রায়ে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, অ্যাপলের অ্যাপ স্টোর ও আইওএস অপারেটিং সিস্টেমকে ইইউর ডিজিটাল মার্কেটস অ্যাক্ট (ডিএমএ) অনুযায়ী ‘গেটকিপার’ হিসেবে চিহ্নিত করার যে সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় কমিশন নিয়েছিল, তা সম্পূর্ণ বৈধ ও বহাল থাকবে। অর্থাৎ, অ্যাপলকে এখন থেকে ইউরোপের বাজারে ব্যবসা করতে হলে এই নতুন ও কঠোর আইনের প্রতিটি নিয়ম পুরোপুরি মেনে চলতে হবে। ২০২৩ সালের মে মাসে কার্যকর হওয়া এই ডিজিটাল মার্কেটস অ্যাক্টের মূল লক্ষ্যই হলো বিগ টেক বা বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া বাণিজ্যিক প্রভাব হ্রাস করা। এর পাশাপাশি ছোট প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাজারে সমান সুযোগ তৈরি করা এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের নিজেদের পছন্দমতো অ্যাপ ব্যবহারের আরও বেশি বিকল্প সুবিধা দেওয়া।
ডিএমএ আইনের কঠোরতা এতটাই বেশি যে, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি এর নিয়ম ভঙ্গ করে তবে তাদের বৈশ্বিক বার্ষিক আয়ের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। এই কঠিন আর্থিক জরিমানার ভয়ে আইনটি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই অ্যাপল, মেটা ও বাইটড্যান্সের মতো শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এর বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আসছিল। এরই অংশ হিসেবে ২০২৪ সালে অ্যাপল আদালতে আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করে। তাদের প্রধান যুক্তি ছিল, আইফোন, আইপ্যাড, ম্যাক, অ্যাপল টিভি ও অ্যাপল ওয়াচের অ্যাপ স্টোরগুলোকে একসঙ্গে একই ক্যাটাগরিতে ‘গেটকিপার’ হিসেবে চিহ্নিত করা মোটেও যৌক্তিক হয়নি। অ্যাপল দাবি করেছিল, প্রতিটি ডিভাইসের কার্যকারিতা ও ইকোসিস্টেম ভিন্ন।
তবে লুক্সেমবার্গের জেনারেল কোর্ট অ্যাপলের সেই দাবি সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়ে ইউরোপীয় কমিশনের সিদ্ধান্তকেই বহাল রেখেছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অ্যাপলের সব ধরনের অ্যাপ স্টোরের মূল উদ্দেশ্য ও কাজের ধরণ একই। এগুলো মূলত বিভিন্ন অ্যাপ নির্মাতাদের সঙ্গে সাধারণ ব্যবহারকারীদের সংযুক্ত করার একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে এবং সফটওয়্যার বিতরণে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। অ্যাপল তাদের আইওএস অপারেটিং সিস্টেমকে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার’ হিসেবে চিহ্নিত করার সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধিতা করেছিল, কারণ এই মর্যাদার কারণে অ্যাপলকে এখন বাধ্য হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সেবার সঙ্গে আরও সহজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
আইমেসেজ প্ল্যাটফর্মটি নিয়েও অ্যাপল তাদের গুরুতর আপত্তি জানিয়েছিল, তবে আদালত বলেছেন যে এ বিষয়ে অ্যাপলের আবেদনটি এই মুহূর্তে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ বর্তমানে আইমেসেজের ওপর ডিজিটাল মার্কেটস অ্যাক্টের নির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতাগুলো পুরোপুরি প্রযোজ্য হয়নি। আদালতের এই রায়ের পর তাৎক্ষণিক এক বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অ্যাপল। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই ডিজিটাল মার্কেটস অ্যাক্ট প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর ও বৈষম্যমূলক। অ্যাপল আরও দাবি করেছে যে, এই আইন তাদের দীর্ঘদিনের তৈরি করা ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিতে পারে, যার ফলে সাধারণ আইফোন ব্যবহারকারীরা নতুন ধরনের সাইবার ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যাপলের এই দাবি মূলত তাদের ইকোসিস্টেম বা বন্ধ দেয়ালের রাজত্ব ধরে রাখার একটি অজুহাত মাত্র। কারণ অ্যাপ স্টোরের বাইরে থেকে অন্য কোনো উৎস বা থার্ড পার্টি সোর্স থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করার সুবিধা দিলে অ্যাপলের একচেটিয়া আয়ের উৎসে বড় ধরনের আঘাত আসবে। তবে জেনারেল কোর্টের এই রায়ের পরও অ্যাপলের জন্য আইনি লড়াইয়ের পথ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। এই রায়ের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সর্বোচ্চ আদালত ‘কোর্ট অব জাস্টিস অব দ্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন’-এ আইনি আপিল করার সুযোগ এখনো রয়েছে তাদের। অ্যাপল হয়তো তাদের ব্যবসা ও স্বার্থ সুরক্ষায় সেই সর্বোচ্চ আদালতেই দ্বারস্থ হবে।
এই আইনি লড়াই কেবল ইউরোপের বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি পুরো বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারের ওপর এক বিশাল প্রভাব ফেলবে। ইউরোপের দেখাদেখি বিশ্বের অন্যান্য দেশ ও অঞ্চলগুলোও যদি বিগ টেক কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য রোধে এমন কঠোর আইন প্রণয়ন করা শুরু করে, তবে তা অ্যাপলের মতো টেক জায়ান্টদের ব্যবসায়িক মডেলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে বাধ্য করবে। ব্যবহারকারীদের স্বাধীনতা এবং বাজার প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার এই লড়াইয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যে কতটা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, এই রায়ের মাধ্যমে তা আবারও প্রমাণিত হলো। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি অ্যাপল ব্যবহারকারী এবং সাধারণ মানুষ এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন এই আইনি লড়াইয়ের পরবর্তী অধ্যায় দেখার জন্য।
পরিশেষে বলা যায়, বিজ্ঞানের অগ্রগতি যেমন মানুষের জীবনকে সহজ করছে, তেমনই বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের এই একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ সাধারণ মানুষের ডিজিটাল স্বাধীনতার ওপর এক ধরণের অদৃশ্য শিকল পরিয়ে দিচ্ছে। ইউরোপীয় আদালতের এই ঐতিহাসিক রায় সেই শিকল ভাঙার প্রথম ধাপ হিসেবে গণ্য হতে পারে। একটি বাংলাদেশ অনলাইন প্রযুক্তির দুনিয়ার এই সকল গুরুত্বপূর্ণ খবর ও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে সবসময় আপনাদের পাশে আছে। আমরা এই মামলার পরবর্তী আপিল ও আইনি প্রক্রিয়ার ওপর গভীর নজর রাখব এবং সব ধরণের আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত আপডেট আপনাদের সামনে বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরব। প্রযুক্তির বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা বজায় থাকুক এবং ব্যবহারকারীদের অধিকার সুরক্ষিত হোক, এটাই এখন সচেতন মহলের একমাত্র প্রত্যাশা।