মিসরের গোল বাতিল নিয়ে মরিনহোর তোপ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬
  • ৪১ বার
মিসরের গোল বাতিল নিয়ে মরিনহোর তোপ

প্রকাশ: ০৮ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ফুটবল বিশ্ব এখন এক গভীর সংকটের মুখোমুখি, যেখানে মাঠের লড়াই ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে প্রযুক্তি ও বিতর্ক। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াইয়ে আর্জেন্টিনা এবং মিসরের মধ্যকার ম্যাচটি কেবল একটি পরাজয় বা জয়ের গল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি হয়ে উঠেছে রেফারিং ও ভিএআর (ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি) প্রযুক্তির ব্যবহারের এক বিতর্কিত উপাখ্যান। ম্যাচের ৫৮তম মিনিটে মিসরের মোস্তফা জিকোর একটি গোল ভিএআরের সহায়তায় বাতিল হওয়ার পর থেকেই ক্ষোভে ফুঁসছে ফুটবল প্রেমী থেকে শুরু করে কিংবদন্তি কোচরাও। এই গোল বাতিল হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পর্তুগিজ কোচ হোসে মরিনহো যে ভাষায় আক্রমণ করেছেন, তা ফুটবলের বর্তমান স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন জুড়ে দিয়েছে।

মরিনহোর মতে, এটি ছিল দিনের আলোয় ডাকাতি। ফুটবলের কৌশলগত দিক নিয়ে তার গভীর জ্ঞান সর্বজনবিদিত, এবং তিনি স্পষ্টতই বিশ্বাস করেন যে ভিএআর প্রযুক্তির এমন ব্যবহার খেলার মৌলিকতাকে নষ্ট করছে। তিনি বলেন, ফুটবল কোথায় যাচ্ছে, এটা সত্যিই লজ্জার। তার মূল আপত্তিটা ছিল সিদ্ধান্তে আসার প্রক্রিয়ার ধরণ নিয়ে। তার দাবি, যদি লিসান্দ্রো মার্তিনেজের সঙ্গে মারওয়ান আত্তিয়ার সংঘর্ষ ফাউল বলেই গণ্য হয়, তবে খেলা তখনই থামানো উচিত ছিল। খেলা চলতে দেওয়া, গোল উদযাপন পর্যন্ত অপেক্ষা করা এবং তারপর অনেকক্ষণ পর ফিরে এসে সেই গোল বাতিল করা—এটি খেলার ছন্দকে পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়। তার এই পর্যবেক্ষণ ফুটবলের অনেক বিশ্লেষক ও সমর্থক সমর্থন করেছেন, যারা মনে করেন প্রযুক্তি এখন খেলার আনন্দ কমিয়ে দিচ্ছে।

এই ঘটনার পর মরিনহো কেবল গোল বাতিলের সমালোচনা করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি বরং ভিএআর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, বড় দলগুলোর ক্ষেত্রে রেফারিদের দৃষ্টিভঙ্গি সবসময়ই একটু বেশি নমনীয় থাকে। তিনি পরোক্ষভাবে দাবি করেছেন যে, আর্জেন্টিনার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত যতটা গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা হয়, মিসরের ক্ষেত্রে সেই একই মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি। তার এই মন্তব্য ফুটবলের রাজনৈতিক এবং পক্ষপাতের বিষয়টি নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। তার বিস্ফোরক মন্তব্য ছিল—আর্জেন্টিনার বিপক্ষে যখন খেলবেন, তখন শুধু মাঠের ১১ জন ফুটবলারকে হারালেই হবে না, আপনাকে লড়তে হবে মাঠের বাঁশি, ভিএআর কক্ষ এবং পুরো টুর্নামেন্টের অলিখিত চিত্রনাট্যের বিরুদ্ধেও।

এই বক্তব্যের রেশ কাটতে না কাটতেই ফুটবল বিশ্লেষকদের মধ্যে বিপরীতমুখী মতামতও লক্ষ্য করা গেছে। ব্রাজিলের গ্লোবোর সাবেক রেফারি ও বিশ্লেষক পিসি অলিভেইরা পুরোপুরি ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তিনি মনে করেন, বিল্ডআপের সময় আত্তিয়ার করা ফাউলটি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট এবং ভিএআরের হস্তক্ষেপ আইনসম্মত ছিল। তার মতে, গোল বাতিল হওয়ার সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ সঠিক ছিল এবং প্রযুক্তি এখানে নিয়ম অনুযায়ীই কাজ করেছে। তবে সমস্যাটা হচ্ছে ফুটবলের ব্যাখ্যার ভিন্নতা নিয়ে। একই ঘটনা দুই জন বিশেষজ্ঞের কাছে দুইভাবে ধরা পড়ছে, যা সাধারণ সমর্থকদের জন্য বিভ্রান্তিকর। একদিকে মরিনহোর মতো কিংবদন্তি কোচ যখন একে ডাকাতি বলেন, অন্যদিকে প্রাক্তন রেফারি একে সঠিক সিদ্ধান্ত বলেন—ফুটবল এখন এক বিশাল দ্বিধার গোলকধাঁধায় আটকা পড়েছে।

ম্যাচটির ফলাফলের কথা বললে, লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলের অবিশ্বাস্য জয় তুলে নিয়েছে। লিওনেল মেসির নেতৃত্বে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের এই প্রত্যাবর্তনের গল্প যতটা রোমাঞ্চকর, রেফারিংয়ের বিতর্ক ততটাই কালো মেঘের মতো জমে আছে এই জয়ের ওপর। অনেক সমালোচক বলছেন, রেফারিংয়ের এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর কারণে খেলার মাঠের আসল লড়াইটা এখন গৌণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রযুক্তি যদি ভুল ধরতেই পারে, তবে কেন তা ম্যাচের উত্তাপ কমিয়ে দেয়? কেন তা বড় দলগুলোকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়—এই প্রশ্নগুলো এখন তুঙ্গে।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, মিসরের খেলোয়াড়দের জন্য এটি একটি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার মতো মুহূর্ত ছিল। কঠোর পরিশ্রম করে যখন তারা গোলটি আদায় করে নিয়েছিল, তখন প্রযুক্তির হস্তক্ষেপে সেই গোল হারিয়ে যাওয়া তাদের মনোবলকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল। একটি বিশ্বকাপে প্রতিটি ম্যাচ প্রতিটি খেলোয়াড়ের জন্য স্বপ্নের মতো। আর সেই স্বপ্ন যখন কোনো অস্পষ্ট প্রযুক্তির সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে ধুলোয় মিশে যায়, তখন তা ফুটবলের মানবিক আবেদনকেই ম্লান করে দেয়। মরিনহোর ক্ষোভ হয়তো সেই খেলোয়াড়দের প্রতি সহমর্মিতা থেকেই এসেছে, যারা মাঠের লড়াইয়ে নিজেদের সবটা উজাড় করে দিয়েও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ বিশ্বকাপ এখন কেবল ফুটবলের ময়দান নয়, বরং প্রযুক্তির অসারতা ও পক্ষপাতের এক গবেষণাগারে পরিণত হয়েছে। ভিএআর প্রযুক্তি খেলার স্বচ্ছতা ফেরানোর কথা থাকলেও তা এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। মরিনহোর মতো ব্যক্তিত্ব যখন এভাবে মুখ খোলেন, তখন বুঝতে হবে ফুটবলের নীতিনির্ধারকদের সময় এসেছে নতুন করে ভাবার। প্রযুক্তি কি খেলাকে এগিয়ে নিচ্ছে, নাকি তার প্রাণশক্তি কেড়ে নিচ্ছে? একটি বাংলাদেশ অনলাইন ফুটবল বিশ্বের এই বিতর্কিত অধ্যায়টির প্রতিটি হালনাগাদ তথ্য আপনাদের কাছে পৌঁছাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা চাই মাঠের লড়াইয়ের জয় যেন বিতর্কের আড়ালে চাপা না পড়ে। দিনশেষে দর্শক মাঠে আসে ফুটবল দেখতে, রেফারিংয়ের খেলা নয়—এই সহজ সত্যটি যত দ্রুত কর্তারা বুঝবেন, ফুটবল ততই সুন্দর হয়ে উঠবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত