বিদায়ের বেদনায় সালাহর নীরব অভিযোগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬
  • ১১ বার
বিদায়ের বেদনায় সালাহর নীরব অভিযোগ

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বকাপের মঞ্চ মানেই স্বপ্ন আর বাস্তবতার এক কঠিন সংঘাত। মিশরের ফুটবল সমর্থকদের জন্য এবারের বিশ্বকাপ ছিল পরম আরাধ্য এক স্বপ্নের মতো, যা শেষ পর্যন্ত এক গভীর হতাশায় রূপ নিয়েছে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে শেষ ষোলোর রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে ২-০ গোলে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিতে হয়েছে মোহাম্মদ সালাহর নেতৃত্বাধীন দলটিকে। ম্যাচের ফলাফল ঘোষণার পর মাঠজুড়ে যখন উৎসবের আমেজ ছিল আর্জেন্টিনার শিবিরে, তখন অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিলেন মোহাম্মদ সালাহ। তার চোখে ছিল একরাশ না বলা কথা এবং দীর্ঘশ্বাস। সরাসরি রেফারিকে কাঠগড়ায় না তুললেও, ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সালাহর কণ্ঠে ছিল এক গভীর বিষাদ এবং স্পষ্ট ইঙ্গিত যে, মাঠের ফয়সালা হয়তো কেবল খেলোয়াড়দের দক্ষতা দিয়ে হয়নি।

ম্যাচ পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় সালাহ যখন সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন, তখন তার প্রতিটি শব্দে ছিল মার্জিত অথচ তীক্ষ্ণ ক্ষোভ। তিনি প্রথমেই সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রেখে বলেন, এটি ছিল আল্লাহর ইচ্ছা। তবে সেই ধর্মীয় বিশ্বাসের আড়ালে তিনি চেপে রাখতে পারেননি বিতর্কিত রেফারিং নিয়ে নিজের অসন্তোষ। তিনি বলেন, প্রথমার্ধে এবং দ্বিতীয়ার্ধের অনেকটা সময় আমরা যেভাবে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিলাম, তাতে জয়ের দাবিদার আমরাই ছিলাম। সালাহর এই কথায় স্পষ্ট যে, তিনি কেবল মাঠের খেলার ওপর বিশ্বাস রাখেন এবং সেই বিশ্বাস অনুযায়ী এই পরাজয় ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রত্যাশিত।

বিতর্কিত রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়েরের সিদ্ধান্তগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করে সালাহ বলেন, রেফারিং নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না, সবাই দেখেছে কী হয়েছে। এই একটি বাক্যই যেন পুরো ম্যাচের সব বিতর্কের সারসংক্ষেপ। একটি গোল বাতিল এবং পেনাল্টি না পাওয়ার মতো সিদ্ধান্তগুলো যে ম্যাচটির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে, তা নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা নেই। সালাহ যখন বলেন, আমার আর কিছু যোগ করার নেই, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, তিনি কতটা গভীরভাবে অনুভব করছেন যে তার দল ন্যায়বিচার পায়নি। কোনো খেলোয়াড় যখন প্রকাশ্যে নিজের হতাশা প্রকাশ করতে গিয়ে এমন নীরব ভাষা ব্যবহার করেন, তখন তা সমর্থকদের হৃদয়ে আরও বেশি আঘাত করে।

সালাহ বিশেষভাবে দুটি মুহূর্তের ওপর আলোকপাত করেন। প্রথমটি হলো ভিএআরের সহায়তায় বাতিল হওয়া সেই গোল, যা মিসরের জন্য ব্যবধান বাড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ ছিল। দ্বিতীয়টি হলো পেনাল্টির দাবি উপেক্ষা করা। তার মতে, রেফারি যখন পেনাল্টি দিলেন না, ঠিক সেই মুহূর্তেই আর্জেন্টিনা পাল্টা আক্রমণে গিয়ে গোল শোধ করার সুযোগ পায়। ফুটবলের গতিপ্রকৃতি যে কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে, তা সালাহ এই ম্যাচে নিজ চোখে দেখলেন। তার ভাষায়, একটি পেনাল্টি বা একটি গোলের ব্যবধান যখন বদলে যায়, তখন আর ফিরে আসার পথ থাকে না।

কোচ এবং দলের বাকি সদস্যদের প্রতি সালাহ যে মমত্ববোধ দেখিয়েছেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তিনি জানান, কোচ তাদের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট ছিলেন এবং চেয়েছিলেন আরও অনেকদূর যেতে। কিন্তু ফুটবল যে অনেক সময় কেবল কৌশলের লড়াই থাকে না, বরং ভাগ্যের ও পরিস্থিতির দাবার বোর্ডে পরিণত হয়, তা সালাহ মেনে নিয়েছেন অনেকটা বাধ্য হয়েই। তিনি জানান, এই বিশ্বকাপ থেকে যা অর্জন করেছি, তার ওপর ভিত্তি করেই আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাব। হারলেও সালাহ তার দল ও দেশের মানুষের প্রতি যে দায়িত্ববোধ দেখিয়েছেন, তা একজন প্রকৃত অধিনায়কের পরিচয় বহন করে।

আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ২-০ গোলে এগিয়ে যাওয়াটা ছিল মিসরের জন্য এক বিশাল প্রাপ্তি। লিওনেল মেসির মতো কিংবদন্তির বিরুদ্ধে লড়াই করা সহজ কোনো কাজ নয়, কিন্তু সালাহ এবং তার দল তা প্রমাণ করেছিলেন। তবে শেষ দিকে মেসি যেভাবে পুরো দলের প্রাণশক্তি হয়ে উঠেছিলেন, তা আর্জেন্টিনার প্রত্যাবর্তনে মূল ভূমিকা পালন করে। সালাহ নিজে একজন বিশ্বমানের তারকা হয়েও যেভাবে মেসির নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন, তা তার বিশাল হৃদয়ের পরিচয় দেয়। তিনি জানেন, মাঠের প্রতিপক্ষ হিসেবে মেসি অদম্য, কিন্তু রেফারিংয়ের বৈষম্য তাকে কতটা পীড়া দিয়েছে, তা তার প্রতিটি কথায় ফুটে উঠেছে।

ফুটবল প্রেমীদের মনে প্রশ্ন জাগছে, কেন প্রযুক্তি থাকার পরেও বিতর্ক থামছে না? সালাহর মতো তারকা খেলোয়াড়রা যখন মাঠে দাঁড়িয়ে দেখেন যে ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বছরের পর বছরের পরিশ্রম বৃথা যাচ্ছে, তখন প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনার অবকাশ তৈরি হয়। সালাহর এই নীরব অভিযোগ কি ফিফা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে? নাকি এটি কেবল আরেকটি বিতর্কের জন্ম দিয়ে ইতিহাসে ঢাকা পড়বে? সালাহ চলে গেছেন ঠিকই, কিন্তু রেখে গেছেন এক অমীমাংসিত প্রশ্ন।

পরিশেষে, খেলাধুলা জয়-পরাজয়ের ঊর্ধ্বে এক মানবিক আবেগের নাম। সালাহ এবং তার সতীর্থরা যেভাবে লড়াই করেছেন, তাতে তারা জয়ী না হতে পারলেও সমর্থকদের ভালোবাসা অর্জন করেছেন। মানুষের জীবনে সাফল্য যেমন আসে, তেমনি ব্যর্থতাও আসে। সালাহ নিজের জীবনের এই ব্যর্থতাকে যেভাবে মেনে নিয়েছেন, তা তার অদম্য মনোবলেরই বহিঃপ্রকাশ। একটি বাংলাদেশ অনলাইন এই মুহূর্তে সালাহর প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করছে এবং ফুটবলের এই কঠিন সময়ে সত্য ও ন্যায়নিষ্ঠ আলোচনার পক্ষে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে ইনশাআল্লাহ মিসর আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসবে—সালাহর এই দৃঢ় বিশ্বাসই যেন মিশরের কোটি ভক্তের আগামী দিনের পাথেয় হয়ে থাকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত