খামেনির শেষ বিদায় ঘিরে উত্তপ্ত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৪ বার
খামেনির শেষ বিদায় ঘিরে উত্তপ্ত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রয়াণ পরবর্তী বিদায়ী আনুষ্ঠানিকতা যখন শোকের আবেশে ছেয়ে আছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এক নতুন ও ভয়াবহ সংঘাতের দিকে মোড় নিয়েছে। ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদে খামেনিকে সমাহিত করার নির্ধারিত দিনটিকে ঘিরে যখন গোটা দেশ গভীর শোকে আচ্ছন্ন, তখন সেখানে মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের অভিযোগ নিয়ে তীব্র উত্তজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি সরাসরি অভিযোগ করেছে যে, খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও তার শেষ বিদায়ের ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ আয়োজনকে ম্লান করে দিতেই সুপরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

আইআরজিসি-র পক্ষ থেকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় প্রদেশসমূহ এবং মাশহাদগামী পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান সড়কের কৌশলগত সেতুগুলোতে মার্কিন বাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। মাশহাদ শহরটি ইরানের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এবং এখানেই আজ বৃহস্পতিবার খামেনিকে শায়িত করার কথা ছিল। আইআরজিসির ভাষ্যমতে, এই হামলা কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর আঘাত নয়, বরং এটি ইরানের জাতীয় শোকের মুহূর্তে একটি চরম অবমাননাকর ও প্ররোচনামূলক কাজ। হামলার প্রতিক্রিয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে ইরান পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে এবং বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে। এই দুই দেশের ঘাঁটি থেকে ইরানের অভ্যন্তরে হামলার সহায়তা দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য না থাকলেও ইরান সরকার তাদের ওপর কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছে।

পরিস্থিতি এতটাই নাজুক হয়েছে যে, ইরানের বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা ও জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার গালিবাফ প্রকাশ্যে হুশিয়ারি দিয়েছেন যে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের নাক গলানো আর সহ্য করা হবে না। ইরান সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ইরানের সার্বভৌমত্বকে আঘাত করছে এবং শোকের এই সময়ে দেশটিকে অস্থিতিশীল করতে চাচ্ছে। আইআরআইবি-র প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, মার্কিন বাহিনী ইরানের আক্কালা শহরের অদূরে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ ‘আক তেখে খান’ সেতু লক্ষ্য করে সাতটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এই হামলার ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। খামেনির শেষ বিদায়কে কেন্দ্র করে যে জনসমাগম প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তা এখন এই হামলার আতঙ্কে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

ইরান সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র তাদের এই আগ্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত না হয়, তবে পুরো অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো ধ্বংসাত্মক হামলার লক্ষ্যবস্তু হবে। ইরানের এই কঠোর অবস্থানের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় এখন যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন এই হামলার ধরন অত্যন্ত রহস্যময়। খামেনির মতো একজন শক্তিশালী নেতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার দিনে এমন স্পর্শকাতর এলাকায় হামলা চালানো কেবল সামরিক কৌশল নয়, বরং এর পেছনে দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের পরিকল্পনা থাকতে পারে। খামেনির শেষ বিদায়কে ঘিরে সাধারণ ইরানি জনগণের মধ্যে যে আবেগ ও জাতীয়তাবাদী চেতনা কাজ করছে, তাকে স্তিমিত করতেই হয়তো এই হামলা চালানো হয়েছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই সংঘাতের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার বরাতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, উভয় দেশই এখন তাদের পূর্ণ সামরিক শক্তি প্রদর্শন করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ইরান তার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও জোরদার করেছে এবং যেকোনো ধরনের মার্কিন আগ্রাসন মোকাবিলার জন্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রাখা হয়েছে। মাশহাদ শহরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে যাতে খামেনির শেষ বিদায় যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়। তবে হামলার ক্ষত এবং পাল্টা হামলার আশঙ্কা সাধারণ মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি করেছে, তা কাটিয়ে ওঠা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে ইরানের অবকাঠামোতে এই হামলা অঞ্চলটির তেল সরবরাহ ও বাণিজ্যের ওপরও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব অপরিসীম, আর সেই এলাকায় উত্তজনা বৃদ্ধির অর্থ হলো বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতা তৈরি হওয়া। ইরান বারবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করছে যে, এই হামলার দায় যুক্তরাষ্ট্রকেই নিতে হবে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত এই হামলার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করেনি। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি উভয় পক্ষ আলোচনার টেবিলে না আসে, তবে এই ছোট ছোট সংঘাতই ভবিষ্যতে একটি বড় আকারের যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাতের রূপ নিতে পারে। শোক ও সংঘাতের এই যুগলবন্দী ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও রহস্যময় করে তুলেছে।

পরিশেষে, খামেনির শেষ বিদায়ের এই দিনটি ইরানের ইতিহাসে কেবল একজন নেতার প্রয়াণ হিসেবে নয়, বরং একটি নতুন সংঘাতের শুরুর দিন হিসেবেও চিহ্নিত হয়ে থাকতে পারে। সাধারণ ইরানি মানুষ আজ অশ্রুসিক্ত নয়নে তাদের প্রিয় নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে মাশহাদে সমবেত হচ্ছে, কিন্তু আকাশজুড়ে থাকা যুদ্ধবিমানের গুঞ্জন তাদের মনে নতুন করে ভয়ের সঞ্চার করছে। ইরান আজ দৃঢ়ভাবে ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা কোনো অবস্থাতেই যুক্তরাষ্ট্রের এই অন্যায় ও উসকানিমূলক হামলার জবাব না দিয়ে ছাড়বে না। শোকের এই মহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে পুরো বিশ্ব এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে। শান্তি আসবে নাকি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাত দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়বে—তা এখন সময়েরই অপেক্ষা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com