১৫ রোগীকে হত্যার দায়ে জার্মানির চিকিৎসকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৫ বার
১৫ রোগীকে হত্যার দায়ে জার্মানির চিকিৎসকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

প্রকাশ: ০৯ জুলাই   ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চিকিৎসা পেশাকে বলা হয় মহান পেশা, যার মূল লক্ষ্য মানুষের জীবন বাঁচানো ও শারীরিক কষ্ট লাঘব করা। কিন্তু সেই পেশার আড়ালে যখন কোনো ব্যক্তি মৃত্যুপুরী গড়ে তোলেন, তখন তা পুরো বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দেয়। জার্মানির বার্লিনের একটি আদালত সম্প্রতি এমন এক ভয়াবহ ও মর্মান্তিক অপরাধের রায় ঘোষণা করেছে, যেখানে ১৫ জন রোগীকে হত্যার দায়ে ৪১ বছর বয়সী এক চিকিৎসককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে তার নাম প্রকাশ না করে কেবল ‘ইয়োহানেস এম.’ নামে পরিচয় দেওয়া হলেও, তার কর্মকাণ্ডের ভয়াবহতা জার্মানসহ পুরো ইউরোপকে কাঁপিয়ে তুলেছে। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত সময়কালে তিনি ১২ জন নারী ও ৩ জন পুরুষ রোগীকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেন।

ভুক্তভোগীদের বয়স ছিল ২৫ থেকে ৯৪ বছরের মধ্যে। তারা সবাই ছিলেন গুরুতর অসুস্থ এবং তাদের শেষ জীবনের যত্ন বা ‘প্যালিয়েটিভ কেয়ার’ প্রদান করাই ছিল ওই চিকিৎসকের মূল দায়িত্ব। কিন্তু চিকিৎসক ইয়োহানেস নিজের হাতেই কেড়ে নিয়েছেন সেই সব অসহায় মানুষের প্রাণ। প্রসিকিউটরদের তথ্য অনুযায়ী, বাড়িতে চিকিৎসা প্রদানের সুযোগ নিয়ে তিনি রোগীদের সম্মতি ছাড়াই বিভিন্ন প্রাণঘাতী ওষুধের মিশ্রণ প্রয়োগ করতেন। বিচার চলাকালীন বেরিয়ে আসে যে, অপরাধের সমস্ত প্রমাণ মুছে ফেলার জন্য তিনি বেশ কয়েকবার ভুক্তভোগীদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো নৃশংস কাজও করেছেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে গ্রেপ্তারের ঠিক আগ মুহূর্তেও তিনি একদিনে দুজন রোগীকে হত্যা করেছিলেন বলে আদালতে প্রমাণিত হয়েছে।

দীর্ঘ এক বছর ধরে চলা এই বিচারকার্যের বেশিরভাগ সময় অভিযুক্ত চিকিৎসক নীরব ছিলেন। কিন্তু বিচারের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে তিনি ১২ জন রোগীকে হত্যার কথা স্বীকার করেন। আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি অত্যন্ত শীতল কণ্ঠে দাবি করেন, রোগীদের কষ্ট ও যন্ত্রণামুক্ত করার জন্যই তিনি এই ‘সহায়তা’ করেছেন এবং তিনি ভেবেছিলেন এটাই তাদের জন্য সবচেয়ে ভালো কাজ। কিন্তু ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বয়ান সেই অদ্ভুত যুক্তিকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে। ২৫ বছর বয়সী এক তরুণীর মা কান্নায় ভেঙে পড়ে আদালতকে জানান, তার মেয়ে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বেঁচে থাকার তীব্র আকুতি জানিয়েছিল। এছাড়া ৭২ বছর বয়সী আরেক ভুক্তভোগীর ছেলে জানান, তার মা ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন এবং মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্ত জীবন নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন। তাদের প্রতিটি শব্দই ছিল ওই চিকিৎসকের করা ‘রোগীর দুঃখকষ্ট মুক্তি’র দাবির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সাক্ষী।

এই ঘটনার সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি হলো, ১৫টি হত্যাকাণ্ডই সম্ভবত পুরো অপরাধের একটি ছোট অংশ মাত্র। তদন্তকারীরা বর্তমানে এই চিকিৎসকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও ৭৬টি রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে নিবিড় অনুসন্ধান চালাচ্ছেন। প্রসিকিউটরদের শঙ্কা, যদি এই নতুন ঘটনাগুলোর অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে এটি জার্মানির ইতিহাসের অন্যতম বড় ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা হিসেবে ইতিহাসে কালো অক্ষরে লেখা থাকবে। বিচারের রায়ে আদালত চিকিৎসকের অপরাধের মাত্রা অত্যন্ত গুরুতর বলে উল্লেখ করেছেন। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি আদালত তাকে স্থায়ীভাবে কারাবন্দি রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে তিনি সমাজের জন্য কোনো প্রকার ঝুঁকির কারণ না হয়ে ওঠেন। একই সঙ্গে তার চিকিৎসা পেশার লাইসেন্স আজীবনের জন্য বাতিল করা হয়েছে।

প্যালিয়েটিভ কেয়ার বা উপশমকারী চিকিৎসার উদ্দেশ্য হলো একজন মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর শেষ দিনগুলোকে কিছুটা প্রশান্তি দেওয়া। কিন্তু ইয়োহানেস এম. সেই মানবিক সেবাকেই পরিণত করেছিলেন এক মরণফাঁদে। তার ওপর আস্থা রেখে পরিবারগুলো যাদের তার হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন, সেই চিকিৎসকই হয়ে উঠেছিলেন তাদের যমদূত। বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি ক্ষমা চাইলেও, তার এই কর্মকাণ্ডের ক্ষত কখনোই শুকানোর মতো নয়। ভুক্তভোগীদের স্বজনরা জানিয়েছেন, একজন চিকিৎসকের কাছ থেকে এমন বিশ্বাসঘাতকতা তারা কল্পনাও করতে পারেননি। পুরো জার্মানি এখন এই চিকিৎসকের মুখোশ উন্মোচনের পর চিকিৎসাসেবার নিরাপত্তা এবং নৈতিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।

আদালতের রায় অনুযায়ী, আসামি ভবিষ্যতে শুরু হতে যাওয়া অতিরিক্ত মামলাগুলোর তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু চিকিৎসকের এই সহযোগিতা কি হারিয়ে যাওয়া প্রাণগুলো ফিরিয়ে দিতে পারবে? আদালতের কঠোর পর্যবেক্ষণ হলো, অপরাধীর মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা যাই হোক, আইন তাকে কোনো ছাড় দেয়নি। সমাজের মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে আজীবনের জন্য কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে পাঠানো হয়েছে। একদিকে শোকের পাহাড় আর অন্যদিকে বিচারের বাণী—এই রায়ের মাধ্যমে কিছুটা হলেও সুবিচারের আশা দেখছেন স্বজনরা। তবে ৭৬টি নতুন মৃত্যুর তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে এই হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা যে আরও অনেক বাড়বে, তা এখন পরিষ্কার।

এই ঘটনা কেবল একটি দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বিশ্বজুড়ে চিকিৎসাসেবার স্বচ্ছতা ও নজরদারি নিয়ে এক বড় সতর্কবার্তা। এমন একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি কীভাবে নৈতিকতার সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করে ধারাবাহিকভাবে খুনের নেশায় মেতে উঠলেন, তা মনোবিজ্ঞানের এক জটিল গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আদালতের রায় প্রদানের সময় বিচারক মন্তব্য করেন যে, অপরাধের ধরন ও ব্যাপ্তি বিচার করলে এই যাবজ্জীবন দণ্ডও লঘু মনে হতে পারে, তবে বিদ্যমান আইনে এটিই সর্বোচ্চ ব্যবস্থা। চিকিৎসকের এই কর্মকাণ্ড কেবল রোগী নয়, বরং গোটা চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর এক বড় আঘাত হেনেছে। জার্মানির মানুষ এখন কেবল এই আশা করছে যে, বাকি থাকা প্রতিটি মৃত্যুর বিচার হবে এবং প্রকৃত সত্য একদিন পুরো বিশ্বের সামনে উন্মোচিত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com