প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পাকিস্তানের অস্থির বেলুচিস্তান প্রদেশে আবারও রক্তক্ষয়ী এক সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। বুধবার দুপুরে প্রদেশের খুজদার শহরের শাহজাদ টাউন এলাকায় পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) বিশিষ্ট নেতা ও ঝালাওয়ান প্যানেলের সভাপতি শফিকুর রহমান মেঙ্গালের বাসভবনে এক ভয়াবহ আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এই নারকীয় হামলায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছেন। একইসাথে এই হামলায় আহত হয়েছেন প্রায় ৩০ জনেরও বেশি মানুষ, যাদের অনেককে আশঙ্কাজনক অবস্থায় নিকটস্থ হাসপাতালগুলোতে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনার পরপরই পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে কঠোর নজরদারি জারি করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার দুপুরে খুজদার শহরে যখন স্বাভাবিক কাজকর্ম চলছিল, তখনই বিস্ফোরকবোঝাই একটি গাড়ি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে মেঙ্গালের বাসভবনের প্রধান ফটক বরাবর এসে আঘাত করে। শক্তিশালী এই বিস্ফোরণে ভবনের বিশাল গেট ও সীমানাপ্রাচীর ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এমনকি বিস্ফোরণের অভিঘাতে আশেপাশের অনেক ভবনের দরজা-জানালার কাচ ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় এবং পুরো শহর ভয়াবহ কম্পনে কেঁপে ওঠে। প্রাথমিক এই আত্মঘাতী বিস্ফোরণের পরপরই আরও কয়েকটি ধারাবাহিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
বিস্ফোরণের পরপরই শুরু হয় সন্ত্রাসীদের সাথে নিরাপত্তা বাহিনীর এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত। খুজদার শহরে যেন এক যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল। সন্ত্রাসীরা রকেট লঞ্চার, হ্যান্ড গ্রেনেড ও স্বয়ংক্রিয় ভারী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালায়। নিরাপত্তা বাহিনীও পাল্টা জবাব দিলে দুই পক্ষের মধ্যে টানা তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তীব্র বন্দুকযুদ্ধ চলে। এই অসম লড়াইয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বীরত্বের সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করেন। স্থানীয় কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বন্দুকযুদ্ধের সময় পাঁচ হামলাকারী নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে কয়েকজন আত্মঘাতী হামলাকারীও ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঝালাওয়ান প্যানেলের মুখপাত্র ও সাধারণ সম্পাদক নাদিমুর রহমান এই মর্মান্তিক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ভয়াবহ এই হামলায় শফিকুর রহমান মেঙ্গাল শারীরিকভাবে অক্ষত আছেন এবং তিনি বর্তমানে নিরাপদে রয়েছেন। তবে তার বাসভবনের নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকা বেশ কয়েকজন সদস্য এই হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। ঘটনার পরপরই খুজদার টিচিং হাসপাতাল এবং সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। আহতদের দ্রুত চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য চিকিৎসকরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। হাসপাতালগুলোতে রক্তদানের জন্য সাধারণ মানুষের ভিড় বাড়ছে।
নিষিদ্ধ ঘোষিত বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) এই পৈশাচিক হামলার দায় স্বীকার করেছে। বেলুচিস্তানে প্রায়ই বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের খবর পাওয়া যায়, তবে মেঙ্গালের মতো প্রভাবশালী নেতার বাড়িতে এমন বড় ধরনের হামলা নিরাপত্তার চরম ঘাটতিকেই নির্দেশ করছে। খুজদার শহরের শাহজাদ টাউন এলাকার বাসিন্দারা এখনো এই ভয়াবহ ঘটনার রেশ কাটিয়ে উঠতে পারছেন না। নিরাপত্তার খাতিরে শহরের সবকটি প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। সন্ত্রাসী চক্রের অবস্থান শনাক্ত করতে পুরো এলাকায় বর্তমানে কঠোর তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
এই হামলা শুধু শফিকুর রহমান মেঙ্গালের ব্যক্তিগত বাসভবনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি পুরো অঞ্চলের জননিরাপত্তার ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বিস্ফোরণের ধোঁয়া এবং বারুদের উৎকট গন্ধ এলাকাটির বাতাসকে ভারী করে তুলেছে। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, কারণ আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। রাজনীতির মাঠের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে এমন পরিকল্পিত হামলা রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আরও উসকে দিতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সন্ত্রাসবাদের এই দানবীয় চেহারা পাকিস্তানের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একটি বাংলাদেশ অনলাইনের পক্ষ থেকে এই ঘটনায় নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করছি। সন্ত্রাসবাদের কোনো স্থানই সভ্য সমাজে নেই। সাধারণ মানুষের জীবন যেখানে অরক্ষিত, সেখানে কোনো ধরনের উন্নয়ন বা রাজনীতি সম্ভব নয়। পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ এই নিরাপত্তা সংকটে যারা অকালে প্রাণ হারালেন, তাদের রক্ত যেন অন্তত পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের মাঝে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে তাগিদ সৃষ্টি করে। আমরা আশা করি, খুজদার শহরের এই ভয়াবহ ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের সরকার দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসবে এবং বেলুচিস্তানে পুনরায় শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।