প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ভারতীয় আগ্রাসনের অভিযোগ এবং জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নের দাবিতে। শুক্রবার বাদ জুমা রাজধানীর বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আয়োজিত এক বিশাল গণমিছিল পূর্ব সমাবেশে দলটির সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, জুলাই অভ্যুত্থান কেবল একটি ফ্যাসিবাদী সরকার উৎখাতের জন্য সংঘটিত হয়নি, বরং এই গণঅভ্যুত্থান দেশ বিক্রির চক্রান্তকারী অপশক্তিকে সমূলে বিনাশ করার লক্ষ্যেই সফল হয়েছে। তার এই বক্তব্যে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াই নতুন মাত্রা পেয়েছে।
মুফতি ফয়জুল করীম তার বক্তব্যে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একদল অসাধু গোষ্ঠী বিভিন্ন সময় নানা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশকে দখল ও খণ্ডবিখণ্ড করার পায়তারা চালাচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের ‘অখণ্ড ভারত’ গড়ার বিতর্কিত মানচিত্র প্রদর্শনের বিষয়টি তিনি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি অভিযোগ করেন, যখনই দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত আসে, তখন সংশ্লিষ্টরা সেগুলোকে সাধারণ ‘স্লিপ অব টাং’ বা কথার ভুল বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু দেশপ্রেমিক জনগণ এসব চাতুর্যপূর্ণ বক্তব্য মেনে নেবে না। তিনি দাবি করেন, সম্প্রতি পশ্চিম বাংলায় মুসলমানদের ওপর যে নির্যাতন ও অমানবিক আচরণ চালানো হচ্ছে, তার সাথে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি ভয়ংকর যোগসূত্র রয়েছে, যা বাংলাদেশেও আমদানির চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে জঙ্গিবাদের কোনো স্থান নেই। তবুও ইসলামপন্থি আলেম-ওলামা এবং মাদরাসা শিক্ষার মূল ভিত্তি ধ্বংস করার জন্য একে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের একটি সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র চলছে। জঙ্গিবাদের এই চর্চা মূলত ভারতের সংস্কৃতি, যা বাংলাদেশের জনমানসে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই জঙ্গি নাটক বন্ধ না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তিনি দেশবাসীকে আহ্বান জানান, দেশের প্রতিটি ইঞ্চি মাটি রক্ষায় সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। প্রয়োজনে জীবন দিয়ে হলেও স্বাধীনতা রক্ষা করা হবে, কারণ এই দেশ আমাদের অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে।
সমাবেশে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ভারতীয় হাইকমিশনারের সাম্প্রতিক বক্তব্যের ব্যাখ্যা দাবি করেন। তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লব ছিল মূলত ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। ভারতের হাইকমিশনারের বিতর্কিত বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, তারা বাংলাদেশকে একটি করদরাজ্য হিসেবে দেখতে চায়। জুলাই বিপ্লব থেকে ভারত কোনো শিক্ষা নেয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, সুশাসন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি দূর করার জন্য জনআকাঙ্ক্ষা থেকেই জুলাই অভ্যুত্থান হয়েছিল। এই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ৭০ শতাংশ মানুষ জুলাই সনদকে সমর্থন দিয়েছে। তিনি পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেন, দেশের মানুষ কোনোভাবেই চায় না বর্তমান সরকার আওয়ামী লীগের মতো স্বৈরাচারী শাসনের পুনরাবৃত্তি ঘটাক। জুলাই সনদের অঙ্গীকার অনুযায়ী সংসদ গঠনের ছয় মাসের মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠনসহ যে প্রতিশ্রুতিগুলো দেওয়া হয়েছে, তা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।
ঢাকা মহানগর উত্তর সভাপতি অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা শেখ ফজলে বারী মাসউদ তার সভাপতির বক্তব্যে বলেন, আমাদের এই স্বাধীনতার ইতিহাস রক্তে ভেজা। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা আজ কতিপয় অসাধু নেতার কারণে বিপন্ন। যারা জনগণের স্বার্থ রক্ষা না করে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য বিদেশি শক্তির কাছে দেশ বিক্রি করে দিতে দ্বিধা করে না, তাদের দ্বারা দেশের কল্যাণ হওয়া অসম্ভব। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে ছাত্র-জনতা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে ফ্যাসিবাদ হটিয়েছে, সেই অর্জনকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে দেওয়া হবে না। তিনি সাম্রাজ্যবাদীদের বন্ধু হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের জাতীয় রাজনীতি থেকে বয়কটের ডাক দেন।
গণমিছিল পূর্ব সমাবেশে দলটির শীর্ষ পর্যায়ের অন্যান্য নেতৃবৃন্দও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেন। তারা বলেন, ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে যে বিভেদ তৈরির চেষ্টা চলছে, তা দেশবিরোধী চক্রান্ত। শান্তিপ্রিয় বাংলাদেশের মানুষ কোনো ধরনের সহিংসতা চায় না, কিন্তু যখন দেশের মানচিত্র ও স্বাধীনতার ওপর আঘাত আসে, তখন চুপ থাকা সম্ভব নয়। বক্তারা সবাই এক বাক্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি সাম্যভিত্তিক ও শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার অঙ্গীকার করেন।
সমাবেশ শেষে পল্টন মোড় থেকে একটি বিশাল গণমিছিল বের করা হয়। বিজয়নগর পানির ট্যাঙ্কি ও পুরানা পল্টন এলাকা প্রদক্ষিণ করে মিছিলটি যখন বিভিন্ন সড়ক অতিক্রম করছিল, তখন সেখানে জনতার স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি দেখা যায়। মিছিল শেষে মোনাজাতের মাধ্যমে দেশ ও জাতির শান্তি এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার তৌফিক কামনা করা হয়। আন্দোলনের শীর্ষ নেতারা হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি জুলাই সনদের দাবিগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয় এবং দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র বন্ধ না হয়, তবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হবে। এই বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সার্বভৌমত্ব এবং আদর্শিক বিশুদ্ধতা রক্ষা করাই এখন সব রাজনৈতিক দলের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।