চুয়াডাঙ্গায় টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা, ভাঙনের শঙ্কায় সড়ক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার
চুয়াডাঙ্গায় টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা, ভাঙনের শঙ্কায় সড়ক

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

টানা বর্ষণে চুয়াডাঙ্গার জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। শুক্রবার গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া বিরামহীন বৃষ্টিতে জেলার চারটি উপজেলা শহর ও পৌর এলাকার বিস্তীর্ণ অংশ জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। রাস্তাঘাটে হাঁটুসমান পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা। নোংরা ড্রেনের পানি বৃষ্টির সঙ্গে মিশে সড়কে ছড়িয়ে পড়ায় নগর ও গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দাদের চলাচল চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে অতিবৃষ্টির তোড়ে জেলার বিভিন্ন সড়কে ভাঙন দেখা দেওয়ায় জনমনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দামুড়হুদা-কার্পাসডাঙ্গা সড়কের একাংশ ধসে পড়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শুক্রবার রাত ৩টা ৪০ মিনিটের পর থেকে একটানা বৃষ্টি শুরু হয়। সকাল গড়ানোর পরও বৃষ্টি থামেনি। ফলে শহরের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, অলিগলি, বাজার এলাকা এবং আবাসিক মহল্লা পানির নিচে তলিয়ে যায়। ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকার্যকর থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অনেক এলাকায় ড্রেন উপচে নোংরা পানি রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করেছে।

চুয়াডাঙ্গা সদর, দামুড়হুদা, আলমডাঙ্গা ও জীবননগর—এই চারটি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কর্মজীবী মানুষ, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও দিনমজুরদের অনেকেই প্রয়োজনীয় কাজেও ঘর থেকে বের হতে পারেননি। শহরের বিভিন্ন সড়কে রিকশা, ইজিবাইক এবং অন্যান্য যাত্রীবাহী যানবাহনের চলাচলও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। কোথাও কোথাও ইঞ্জিনচালিত যানবাহন পানি অতিক্রম করতে গিয়ে বিকল হয়ে পড়ে।

জলাবদ্ধতার পাশাপাশি জেলার সড়ক অবকাঠামোও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে দামুড়হুদা উপজেলার চিৎলা-গোবিন্দহুদা এলাকায় দামুড়হুদা-কার্পাসডাঙ্গা সড়কের পাশে বড় ধরনের ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় ফসলি জমি থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। হাজার হাজার ট্রাক্টরে করে বালু পরিবহনের কারণে সড়কের পাশের মাটি দুর্বল হয়ে পড়ে। তার ওপর টানা বৃষ্টির পানির তোড়ে সড়কের একাংশ ভেঙে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

এলাকাবাসীর আশঙ্কা, দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে যে কোনো সময় বড় ধরনের ধস নেমে পুরো সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ যাতায়াত করেন। পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার এবং জরুরি সেবার জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। ফলে সড়কের বর্তমান অবস্থা স্থানীয় অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

শুধু দামুড়হুদা-কার্পাসডাঙ্গা সড়কই নয়, জয়রামপুর কাঁঠালতলা বাজার থেকে কুমারীদহগামী সড়কেরও একটি অংশ ধসে গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি মসজিদের নিকটবর্তী অংশে রাস্তার মাটি সরে গিয়ে বড় ধরনের ফাটল তৈরি হয়েছে। এতে ওই সড়কে যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। অনেক চালক বিকল্প পথ ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন।

এদিকে বৃষ্টির কারণে জেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমিও পানিতে তলিয়ে গেছে। বিভিন্ন এলাকার নিচু জমিতে পানি জমে থাকায় আমন ধানের বীজতলা, শাকসবজি এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসল ক্ষতির মুখে পড়েছে। কৃষকদের অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, পানি দ্রুত নেমে না গেলে ফসলের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কৃষিভিত্তিক এই জেলায় অতিবৃষ্টির কারণে কৃষকদের উদ্বেগও দিন দিন বাড়ছে।

শহরের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে। ক্রেতার উপস্থিতি কমে যাওয়ায় দোকানপাটে বিক্রি কমেছে। অনেক ছোট ব্যবসায়ী জানান, সারাদিন দোকান খোলা রাখলেও বৃষ্টির কারণে ক্রেতা না থাকায় প্রত্যাশিত বিক্রি হয়নি। অন্যদিকে দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষের আয়ও কমে গেছে। যারা প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য টানা বৃষ্টি নতুন করে আর্থিক সংকট তৈরি করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জলাবদ্ধতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট পৌরসভা ও উপজেলা প্রশাসনের দৃশ্যমান তৎপরতা খুব একটা চোখে পড়েনি। বিভিন্ন এলাকায় পানি নিষ্কাশনের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ড্রেন পরিষ্কার বা পাম্পের মাধ্যমে পানি অপসারণের কার্যক্রম না থাকায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। অনেকেই মনে করছেন, বর্ষা মৌসুমের আগে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে বর্তমান পরিস্থিতির অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হতো।

তবে দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লাভলী ইয়াসমিন জানিয়েছেন, তিনি ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তার সঙ্গে উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত কীভাবে মেরামত করে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কাজ চলছে বলে তিনি জানান। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

চুয়াডাঙ্গা প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামিনুর রহমান জানান, শুক্রবার রাত ৩টা ৪০ মিনিট থেকে শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত জেলায় ১৬৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। স্বল্প সময়ে এত বিপুল পরিমাণ বৃষ্টিপাত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা ও পানি জমে যাওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়ার বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় আরও বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে নিচু এলাকার মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতা বাড়ছে। ফলে পুরোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও দুর্বল অবকাঠামো এমন বৃষ্টিপাতের চাপ সামাল দিতে পারছে না। একই সঙ্গে সড়কের পাশ থেকে অবৈধভাবে মাটি বা বালু উত্তোলনের মতো কর্মকাণ্ড সড়কের স্থায়িত্বকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। তাই শুধু জরুরি মেরামত নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে টেকসই ড্রেনেজ ব্যবস্থা, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চুয়াডাঙ্গাবাসী এখন বৃষ্টির বিরতি এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের অপেক্ষায় রয়েছেন। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ সড়কগুলো দ্রুত সংস্কার এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রত্যাশা, সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে জনদুর্ভোগ কমবে এবং সম্ভাব্য বড় ধরনের দুর্ঘটনাও এড়ানো সম্ভব হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত