প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ায় শনিবার দেশের অন্তত ১৯টি জেলার ওপর দিয়ে ঝোড়ো হাওয়াসহ বজ্রবৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সকাল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে এসব এলাকায় ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা থাকায় সংশ্লিষ্ট নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের শনিবার সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোর জন্য প্রকাশিত বিশেষ পূর্বাভাসে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সংস্থাটির মতে, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বায়ুমণ্ডলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে কোথাও কোথাও স্বল্প সময়ের জন্য ঝোড়ো হাওয়া, বজ্রপাত এবং মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং সিলেট অঞ্চলের ওপর দিয়ে দক্ষিণ অথবা দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ীভাবে দমকা কিংবা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্কসংকেত প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, বর্ষা মৌসুমে এ ধরনের আবহাওয়াগত পরিবর্তন স্বাভাবিক হলেও বজ্রপাত এবং আকস্মিক দমকা হাওয়া নৌযান চলাচল, কৃষিকাজ এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ছোট নৌযান, মাছ ধরার ট্রলার এবং নদীপথে চলাচলকারী যাত্রীবাহী নৌকাগুলোকে অতিরিক্ত সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নদীপথে চলাচলকারী যাত্রী ও মাঝিদের জন্য এই সতর্কবার্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ঝোড়ো হাওয়ার সময় নদীতে ঢেউয়ের উচ্চতা হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। এতে ছোট নৌযান দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই আবহাওয়ার সর্বশেষ তথ্য জেনে প্রয়োজন ছাড়া নদীপথে যাতায়াত না করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঝড়ো হাওয়ার পাশাপাশি বজ্রপাতের ঝুঁকিও রয়েছে। বজ্রপাত বাংলাদেশের অন্যতম প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। তাই খোলা মাঠ, উঁচু গাছের নিচে অবস্থান, জলাশয়ে মাছ ধরা কিংবা বজ্রপাতের সময় ধাতব বস্তু স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে সম্ভাব্য বৃষ্টিপাত কৃষিখাতের জন্য মিশ্র প্রভাব ফেলতে পারে। যেসব এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টির ঘাটতি রয়েছে, সেখানে কৃষকরা কিছুটা স্বস্তি পেলেও অতিবৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চলগুলোতে নতুন করে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে নিচু জমিতে আমন ধানের বীজতলা, শাকসবজি এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা স্থানীয় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
শহরাঞ্চলেও ভারী বর্ষণ হলে জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল দখল এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই অনেক শহরে সড়ক ডুবে যায়। এতে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে, অফিসগামী মানুষ দুর্ভোগে পড়েন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই স্থানীয় প্রশাসনকে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল রাখার বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোও আবহাওয়ার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ঝোড়ো হাওয়ার কারণে কোথাও গাছ উপড়ে পড়া, বিদ্যুতের খুঁটি বা তার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে জরুরি সেবা সংস্থাগুলোকেও সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বর্ষা মৌসুমে স্বল্প সময়ের মধ্যে তীব্র বৃষ্টিপাত এবং আকস্মিক ঝোড়ো হাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়মিত অনুসরণ করা এবং সতর্কবার্তা মেনে চলা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নদীবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১ নম্বর সতর্কসংকেত জারি করা হলেও এটি আতঙ্কের বিষয় নয়; বরং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম সতর্কতা। তবে মাঝি, জেলে এবং নৌযান পরিচালনাকারীদের অবশ্যই আবহাওয়ার সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। বিশেষ করে ছোট নৌযানগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যে বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসনও পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। কোথাও অতিবৃষ্টি বা ঝড়ের কারণে জরুরি পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দিনের বিভিন্ন সময়ে আবহাওয়ার পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে। তাই জনগণকে নিয়মিত আবহাওয়ার হালনাগাদ পূর্বাভাস অনুসরণ করার পাশাপাশি প্রয়োজন ছাড়া ঝড়-বৃষ্টির সময় বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং নৌপথ ব্যবহারকারীদের অতিরিক্ত সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বর্ষা মৌসুমের এই বৈরী আবহাওয়ায় সচেতনতা ও আগাম প্রস্তুতিই ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সময়মতো সতর্কবার্তা অনুসরণ এবং নিরাপত্তা নির্দেশিকা মেনে চললে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।