দেড় লাখ পরিবার এখনো পানিবন্দি, দুর্যোগে বাড়ছে মানবিক সংকট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
  • ৫ বার
দেড় লাখ পরিবার এখনো পানিবন্দি, দুর্যোগে বাড়ছে মানবিক সংকট

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় টানা ভারী বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং পাহাড়ধসের কারণে সৃষ্ট দুর্যোগ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। কোথাও কোথাও বন্যার পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করলেও লাখো মানুষ এখনো দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। পানিবন্দি পরিবারগুলোর বড় একটি অংশ নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য, চিকিৎসা এবং স্যানিটেশন সংকটে রয়েছে। সরকারি হিসাবে সাতটি জেলায় এখনো এক লাখ ৫৫ হাজার ৩১১টি পরিবার পানিবন্দি রয়েছে এবং বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১ জনে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সোমবার (১৩ জুলাই) প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, চলমান বন্যা ও পাহাড়ধসে এ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৫৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। আহত হয়েছেন আরও ৩৯ জন। প্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও অনেক দুর্গম এলাকায় মানুষের দুর্ভোগ এখনো অব্যাহত রয়েছে।

সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব জেলার মোট ৫৯টি উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। পাশাপাশি ৩৩৪টি ইউনিয়ন এবং ১২টি পৌরসভা সরাসরি বন্যার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি এবং পাহাড়ধসের কারণে বহু সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

প্রাণহানির পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে কক্সবাজার জেলায়। সেখানে ৩১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। চট্টগ্রামে ১৩ জন, বান্দরবানে ছয় জন, রাঙ্গামাটিতে তিন জন এবং মৌলভীবাজারে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এসব মৃত্যুর পেছনে পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যার স্রোত, দেয়াল ধস এবং পানিতে ডুবে যাওয়ার মতো বিভিন্ন কারণ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

আহতদের সংখ্যাও কম নয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোট ৩৯ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে কক্সবাজারে ২৪ জন, চট্টগ্রামে ১২ জন, বান্দরবানে দুই জন এবং খাগড়াছড়িতে একজন আহত হয়েছেন। অনেক আহত ব্যক্তি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। দুর্গত এলাকায় প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিমও কাজ করছে।

বন্যা ও পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে এক হাজার ৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ইতোমধ্যে ৩৮ হাজার ৪২২ জন আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানীয় জল, শিশু খাদ্য, স্যানিটেশন সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। তবে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্গত এলাকার ব্যাপকতা বিবেচনায় আরও সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।

দুর্যোগ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। বন্যাকবলিত ১১ জেলায় স্বাস্থ্যসেবা নির্বিঘ্ন রাখতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলায় মেডিকেল টিম মোতায়েন করা হয়েছে। এসব টিম পানিবাহিত রোগ, সাপের কামড়, ডায়রিয়া, জ্বর, ত্বকের সংক্রমণ এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রদানে কাজ করছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেছেন, চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ, স্যালাইন, অ্যান্টিভেনম, জীবাণুনাশক ও অন্যান্য চিকিৎসাসামগ্রী দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কোনো এলাকায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত না হয়, সে বিষয়েও বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, বর্তমানে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, কুমিল্লা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিটি জেলার সার্বিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি তদারকির জন্য একজন করে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সার্বক্ষণিকভাবে তথ্য সংগ্রহ, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের কাজ করছে।

দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, টানা বৃষ্টিপাত এবং পাহাড়ি এলাকায় অপরিকল্পিত বসতি, পাহাড় কাটা ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসের কারণে প্রাণহানির ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। তারা মনে করছেন, তাৎক্ষণিক উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি স্থানান্তর, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পাহাড় সংরক্ষণ এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় ভবিষ্যতেও একই ধরনের দুর্যোগে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা থেকে যাবে।

এদিকে আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোও পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে। কোথাও কোথাও পানি কমতে শুরু করলেও নিচু এলাকা এবং নদীসংলগ্ন অঞ্চলে এখনো জলাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক পরিবার নিজ বাড়িতে ফিরতে পারেনি। কৃষিজমি, মাছের ঘের, গবাদিপশু এবং গ্রামীণ অবকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। ত্রাণ বিতরণ, উদ্ধার, চিকিৎসাসেবা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও মানবিক সংগঠনগুলোর মতে, দুর্গম এলাকায় এখনো অনেক পরিবার পর্যাপ্ত সহায়তা পায়নি। বিশেষ করে শিশু, নারী, প্রবীণ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত উদ্ধার, ত্রাণ ও স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রস্তুত করে পুনর্বাসন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্গঠন, কৃষি পুনর্বাসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামতের কাজও ধাপে ধাপে শুরু করা হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসন সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকা, নদীতীরবর্তী অঞ্চল এবং জলাবদ্ধ এলাকায় অপ্রয়োজনে চলাচল না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে নিরাপদ স্থানে অবস্থান এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত