চুয়াডাঙ্গায় বিএনপি-জামায়াত উত্তেজনা, তদন্তে প্রশাসন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
  • ২ বার
চুয়াডাঙ্গায় বিএনপি-জামায়াত উত্তেজনা, তদন্তে প্রশাসন

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলায় একটি মডেল মসজিদে আয়োজিত কোরআন শিক্ষা কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ এবং সংঘর্ষের ঘটনা স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে উসকানি, হামলা ও অসদাচরণের অভিযোগ তুলেছে। এ ঘটনায় অন্তত নয়জন আহত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসন ও পুলিশ দ্রুত হস্তক্ষেপ করেছে এবং বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার (১২ জুলাই) দুপুরে দামুড়হুদা উপজেলা মডেল মসজিদের একটি কক্ষে জামায়াতে ইসলামীর নারী বিভাগের উদ্যোগে ‘তালিমুল কোরআন’ শীর্ষক একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে শতাধিক নারী অংশগ্রহণ করেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সরকারি একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ তুলে বিএনপির স্থানীয় নেতারা আপত্তি জানান। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে বাকবিতণ্ডা সৃষ্টি হয়।

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মন্টু মিয়াকে নিয়ে একটি মানহানিকর পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে বলে বিএনপির অভিযোগ। দলটির দাবি, ছাত্রশিবিরের এক ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা ওই পোস্টটি শেয়ার করেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রোববার দুপুরে ওই ব্যক্তিকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে পড়ে এবং বিকেলে দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে চলে যায়।

জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের দাবি, প্রশিক্ষণ চলাকালে কয়েকজন বিএনপি নেতাকর্মী তাদের নারী সদস্যদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন। এ ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে তারা কর্মসূচির ডাক দিলে বিএনপির পক্ষ থেকেও পাল্টা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। তাদের অভিযোগ, এতে তাদের অন্তত চারজন নেতাকর্মী আহত হন।

অন্যদিকে উপজেলা বিএনপির নেতারা দাবি করেছেন, মডেল মসজিদের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করা অনুচিত। তারা অভিযোগ করেন, বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর জামায়াতের কর্মীরা উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। পরে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করা হয় এবং বিএনপি ও সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয়। বিএনপির দাবি, সংঘর্ষে তাদের পাঁচজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।

পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লাভলী ইয়াসমিন রোববার বিকেলে দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে আমন্ত্রণ জানান। তবে সেখানে উপস্থিত হওয়ার পরও দুই পক্ষের মধ্যে তর্কাতর্কি শুরু হয়। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি আবেদ উদ দৌলা টিটন বলেন, শনিবার তাদের নারী সদস্যদের মডেল মসজিদে অপমান ও গালিগালাজ করা হয়। রোববার তাদের এক কর্মীকেও মারধর করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি আরও দাবি করেন, ইউএনওর ডাকে আলোচনায় যাওয়ার সময়ও তাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা হয়। তবে তিনি বলেন, মডেল মসজিদ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েই কোরআন শিক্ষা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল এবং পরে পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যেই তারা পূর্বঘোষিত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করেন।

অন্যদিকে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. রফিকুল হাসান তনু বলেন, প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই মডেল মসজিদে একটি রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা স্থানীয় জনগণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলের নেতাকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট প্রচারেরও সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন তিনি। তার অভিযোগ, জামায়াতের নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন এবং উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন।

দামুড়হুদা মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আজাদ রহমান জানান, সংঘর্ষে আহত ছাত্রশিবিরের সাবেক এক কর্মী পুলিশের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তবে সোমবার বিকেল পর্যন্ত কোনো পক্ষ আনুষ্ঠানিক মামলা বা লিখিত অভিযোগ দায়ের করেনি বলে তিনি জানান।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লাভলী ইয়াসমিন বলেন, মডেল মসজিদে অনুমতি ছাড়া কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে কি না, তা প্রশাসন গুরুত্বসহকারে তদন্ত করছে। এ ঘটনায় উপজেলা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ফিল্ড সুপারভাইজার শাহজাহান আলীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে। তদন্তে যে তথ্য পাওয়া যাবে, তার ভিত্তিতেই প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের ঘটনা বেড়েছে। তারা মনে করেন, যেকোনো বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সরকারি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যবহার সংক্রান্ত নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করার ওপরও তারা গুরুত্বারোপ করেছেন।

এদিকে ঘটনাকে কেন্দ্র করে দামুড়হুদা উপজেলায় রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছে প্রশাসন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত