জলাবদ্ধতা কমাতে কুমিল্লায় ভাঙা হলো দুটি কালভার্ট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
  • ৩ বার
জলাবদ্ধতা কমাতে কুমিল্লায় ভাঙা হলো দুটি কালভার্ট

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

টানা ভারী বর্ষণ ও আকস্মিক জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত কুমিল্লা নগরীতে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে অভিযান শুরু করেছে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক)। দীর্ঘদিন ধরে খাল ও ড্রেনের ওপর অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত বিভিন্ন স্থাপনা চিহ্নিত করার পর প্রথম ধাপে দুটি বড় কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব স্থাপনা খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছিল এবং সাম্প্রতিক ভয়াবহ জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সোমবার (১৩ জুলাই) দিনভর কুমিল্লা নগরীতে নজিরবিহীন জলাবদ্ধতার পর পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে কুসিক জরুরি ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়। সন্ধ্যার দিকে কান্দি খালের নোয়াগাঁও চৌমুহনী থেকে মডার্ন হাসপাতাল পর্যন্ত এলাকায় নির্মিত দুটি বড় কালভার্ট এক্সকাভেটরের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়। অভিযান চলাকালে কুসিকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে কার্যক্রম তদারকি করেন।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, নগরীর বৃষ্টির অধিকাংশ পানি কান্দিরপাড়, মনোহরপুর ও নোয়াগাঁও চৌমুহনী হয়ে প্রবাহিত কান্দি খালের মাধ্যমে শহরের বাইরে চলে যায়। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক প্রয়োজনে খালের ওপর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ছোট-বড় কালভার্ট, কংক্রিটের সেতু এবং স্টিলের ব্রিজ নির্মাণ করায় পানি প্রবাহ সংকুচিত হয়ে পড়ে। ফলে অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা ক্রমেই বাড়তে থাকে।

সোমবারের প্রবল বর্ষণে কুমিল্লা শহরের বহু সড়ক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক এলাকা পানিতে ডুবে যায়। বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। জলাবদ্ধতার কারণে অনেক বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে এবং বিভিন্ন স্থানে গুরুত্বপূর্ণ সেবা কার্যক্রমও বিঘ্নিত হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা স্থাপনাগুলো দ্রুত অপসারণের উদ্যোগ নেয় সিটি করপোরেশন।

অভিযান চলাকালে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নোয়াগাঁও এলাকায় নির্মিত দুটি বড় কালভার্ট দীর্ঘদিন ধরেই পানি নিষ্কাশনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছিল। ভারী বৃষ্টির সময় খালের পানি স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে না পারায় আশপাশের এলাকায় দ্রুত জলাবদ্ধতা তৈরি হতো। তাদের মতে, এসব স্থাপনা অপসারণের ফলে ভবিষ্যতে পানি নিষ্কাশনের গতি বাড়বে এবং জলাবদ্ধতার তীব্রতাও কমতে পারে।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, নগরবাসীকে পানির মধ্যে ফেলে রেখে কেউ নিজের সুবিধার জন্য খালের ওপর অবৈধভাবে ব্রিজ বা কালভার্ট নির্মাণ করতে পারবে না। যেসব স্থাপনা পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে অপসারণ করা হবে। তিনি জানান, কেবল দুটি কালভার্ট ভেঙে ফেলার মধ্যেই অভিযান সীমাবদ্ধ থাকবে না; পুরো নগরীর খাল ও বড় ড্রেনের ওপর নির্মিত সব ধরনের প্রতিবন্ধক স্থাপনা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, নগর পরিকল্পনায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেন পরিষ্কার, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। নগরবাসীর সহযোগিতা ছাড়া এ ধরনের উদ্যোগ সফল করা সম্ভব নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

অভিযানে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মামুন, নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সায়েম ভূঁইয়াসহ প্রকৌশল বিভাগ এবং প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। তারা খালের বিভিন্ন অংশ পরিদর্শন করে আরও যেসব স্থাপনা পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে, সেগুলোর তালিকা প্রস্তুতের কাজও শুরু করেছেন।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু ড্রেন পরিষ্কার করলেই জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। খাল ও প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের পথ দখলমুক্ত রাখা, অপরিকল্পিত স্থাপনা অপসারণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাই কার্যকর সমাধানের মূল শর্ত। পাশাপাশি নতুন অবকাঠামো নির্মাণের আগে পানি প্রবাহের ওপর তার প্রভাব মূল্যায়নের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।

পরিবেশ ও নগর উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতা বাড়ছে। ফলে পুরোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নয়। এ অবস্থায় নগরীর খাল, ড্রেন ও জলাধারগুলোকে কার্যকর রাখা এবং অবৈধ দখলমুক্ত করা জরুরি। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের জলাবদ্ধতা ও নগর দুর্যোগের আশঙ্কা রয়েছে।

সাম্প্রতিক অভিযানের মাধ্যমে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা নগরবাসীর মধ্যে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি করেছে। স্থানীয়দের আশা, পরিকল্পিতভাবে খাল পুনরুদ্ধার এবং প্রতিবন্ধক স্থাপনা অপসারণের কাজ অব্যাহত থাকলে বর্ষা মৌসুমে কুমিল্লা নগরীর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত