ডিজিটাল মাদক বাণিজ্যে মৃত্যুদণ্ডের বিধান পাস

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার
ডিজিটাল মাদক বাণিজ্যে মৃত্যুদণ্ডের বিধান পাস

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে প্রযুক্তিনির্ভর মাদক চোরাচালান ও অনলাইনভিত্তিক অবৈধ মাদক বাণিজ্য দমনে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে সংসদে পাস হয়েছে মাদক নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল, ২০২৬। নতুন আইনে সাইবার মাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল অ্যাপ, ওয়েবসাইট, ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম, ই-ওয়ালেট এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে মাদক কেনাবেচা বা সংশ্লিষ্ট অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের ব্যবস্থাও সংযুক্ত করা হয়েছে।

সোমবার (১৩ জুলাই) জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি উত্থাপন করেন। পরে জনমত যাচাই, সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো, সংশোধনী প্রস্তাব নিষ্পত্তি এবং সংসদীয় কমিটির সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করার পর কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের সুযোগ নিয়ে অপরাধচক্রগুলো যেভাবে মাদক ব্যবসার নতুন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে, তা মোকাবিলায় বিদ্যমান আইনের সংশোধন প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।

নতুন আইনে ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত মাদক-সংক্রান্ত অপরাধের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত করা হয়েছে। আইনের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাইবার স্পেস, ডিজিটাল ডিভাইস, ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ইলেকট্রনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা কিংবা অন্য যেকোনো ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাদকদ্রব্য বা মনঃপ্রভাবকারী পদার্থ কেনা, বিক্রি, সরবরাহ, প্রচার, বিজ্ঞাপন, যোগাযোগ, সমন্বয় অথবা অন্য কোনো অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনকে অপরাধের আওতায় আনা। কোনো ব্যক্তি যদি ই-ওয়ালেট, ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম, ভার্চুয়াল অ্যাসেট কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করেন বা এমন চেষ্টা করেন, তাহলেও সেটি আইনের আওতায় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অপরাধীরা সাম্প্রতিক সময়ে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প ডিজিটাল আর্থিক মাধ্যম ব্যবহার করে লেনদেন করার প্রবণতা বাড়িয়েছে। নতুন আইন সেই প্রবণতা মোকাবিলার উদ্দেশ্যেই প্রণয়ন করা হয়েছে।

সংশোধিত আইনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে বিচার প্রক্রিয়ায়। ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত মাদক-সংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে সরাসরি মাদকদ্রব্য উদ্ধার হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। তদন্তে যদি ডিজিটাল যোগাযোগ, অনলাইন লেনদেন, ইলেকট্রনিক তথ্যপ্রমাণ অথবা অন্যান্য গ্রহণযোগ্য ডিজিটাল আলামতের মাধ্যমে অপরাধের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়, তাহলে আদালত সেই তথ্যের ভিত্তিতেই বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন।

আইনে বলা হয়েছে, এ ধরনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে আদালত অপরাধের প্রকৃতি ও গুরুত্ব বিবেচনায় যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ড থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দিতে পারবেন। একই সঙ্গে যদি অপরাধটি আন্তর্জাতিক মাদক চক্র বা সংঘবদ্ধ অপরাধী গোষ্ঠীর অংশ হিসেবে সংঘটিত হয়, তাহলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে।

ডিজিটাল অপরাধের আর্থিক ভিত্তি ভেঙে দিতে নতুন আইনে আদালত ও মাদক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালকে অতিরিক্ত ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। বিচারিক কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনবোধে অপরাধে ব্যবহৃত ডিজিটাল ডিভাইস, অনলাইন অ্যাকাউন্ট, পেমেন্ট সিস্টেম, ই-ওয়ালেট, ভার্চুয়াল সম্পদ এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি জব্দ, বাজেয়াপ্ত, অপসারণ অথবা রাষ্ট্রের অনুকূলে ন্যস্ত করার নির্দেশ দিতে পারবেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল অপরাধীকে শাস্তি দেওয়াই নয়, বরং অপরাধের আর্থিক অবকাঠামো ধ্বংস করাও এই আইনের অন্যতম লক্ষ্য।

সংশোধিত আইনের মাধ্যমে মাদকপ্রবণ এলাকায় পৃথক মাদক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান পুনর্বহাল করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত আদালতেও বিচার কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ বহাল রাখা হয়েছে। এর ফলে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং বিচারিক কার্যক্রমে গতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে নতুন ক্ষমতাও যুক্ত করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, অধিদপ্তর নিজস্ব ডগ স্কোয়াড গঠন করতে পারবে এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বিধি অনুসারে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ক্ষমতাও পাবে। সরকারের মতে, সীমান্ত এলাকায় অভিযান, গুদাম তল্লাশি, আন্তর্জাতিক চোরাচালান প্রতিরোধ এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে এসব সক্ষমতা কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাদক ব্যবসার ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে। প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপটেড মেসেজিং অ্যাপ, অনলাইন বিজ্ঞাপন এবং ভার্চুয়াল লেনদেন ব্যবস্থার মাধ্যমে মাদক কেনাবেচার অভিযোগ বাড়ছে। ফলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য অপরাধ শনাক্ত ও প্রমাণ সংগ্রহ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। নতুন সংশোধনী সেই বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলার আইনি ভিত্তি শক্তিশালী করার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, কঠোর শাস্তির পাশাপাশি আইনের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ, বিচারিক স্বচ্ছতা এবং অভিযুক্তের ন্যায়বিচারের অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দমনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা উন্নয়নও সমানভাবে জরুরি।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের অক্টোবরে জাতীয় সংসদে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ পাস হয়েছিল। সেই আইনে ২০০ গ্রামের বেশি ইয়াবা অথবা ২৫ গ্রামের বেশি হেরোইন কিংবা কোকেন বহনের দায়ে দোষী ব্যক্তির জন্য মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছিল। সর্বশেষ সংশোধনের মাধ্যমে আইনটির পরিধি আরও বিস্তৃত করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও প্রযুক্তিনির্ভর মাদক বাণিজ্যকে স্পষ্টভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সরকারের প্রত্যাশা, নতুন এই আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে অনলাইনভিত্তিক মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে আসবে, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের আর্থিক নেটওয়ার্ক দুর্বল হবে এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার করে পরিচালিত মাদক বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো আরও কার্যকরভাবে ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত