বৃষ্টি-বন্যায় এইচএসসি, সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র বিতর্ক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
  • ৫ বার
বৃষ্টি-বন্যায় এইচএসসি, সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র বিতর্ক

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

টানা ভারী বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং জলাবদ্ধতার মধ্যে চলমান এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা নিয়ে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কোমরসমান পানি, নৌকা, ভ্যান কিংবা স্বজনের কাঁধে ভর করে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়েছে বহু শিক্ষার্থীকে। কেউ ভেজা পোশাক, কেউ ভেজা জুতা-মোজা, আবার কেউ পানিতে ভিজে যাওয়া প্রবেশপত্র নিয়েই তিন ঘণ্টার পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষাবিদ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড এবং আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কয়েক দিন ধরে অব্যাহত ভারী বর্ষণ এবং মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তার কারণে বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অনেক জেলা জলাবদ্ধতা ও বন্যায় আক্রান্ত হয়। এমন পরিস্থিতিতেও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন পাঁচ জেলার পরীক্ষা স্থগিত থাকলেও দেশের বাকি আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পূর্বঘোষিত সূচি অনুযায়ী পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্র, হিসাববিজ্ঞান প্রথম পত্র এবং যুক্তিবিদ্যা প্রথম পত্রের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

সোমবার ভোর থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী বৃষ্টি শুরু হলে অনেক এলাকায় সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন জেলার পরীক্ষার্থীরা চরম দুর্ভোগের মধ্যে কেন্দ্রে পৌঁছান। কোথাও পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় পানির মধ্য দিয়ে হেঁটে, কোথাও নৌকায়, আবার কোথাও বিকল্প যানবাহনে করে পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ের আগেই বাড়ি থেকে বের হলেও জলাবদ্ধতার কারণে কেন্দ্রে পৌঁছাতে ব্যাপক বিড়ম্বনার মুখে পড়েন।

অভিভাবকদের অভিযোগ, এমন প্রতিকূল পরিবেশে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপের মধ্যে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ কেন্দ্রের এক অভিভাবক বলেন, তার মেয়ে পুরো শরীর ভিজিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশ করেছে। এমন অবস্থায় তিন ঘণ্টার পরীক্ষা দেওয়া একজন শিক্ষার্থীর জন্য কতটা কঠিন, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় আনা উচিত ছিল। আরও কয়েকজন অভিভাবক জানান, তাদের সন্তানরা আতঙ্ক, উদ্বেগ এবং শারীরিক ক্লান্তি নিয়ে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করেছে, যা স্বাভাবিক পরীক্ষার পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এই পরিস্থিতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে অনেকেই পরীক্ষা স্থগিত না করার বিষয়টিকে অমানবিক বলে মন্তব্য করেছেন। চিকিৎসক ও অ্যাক্টিভিস্ট সাদিকুর রহমান সাদাব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, আবহাওয়ার আগাম সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের জন্য অযৌক্তিক ছিল। লেখক সাদমান আব্দুল্লাহও মন্তব্য করেছেন, এমন সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎকে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। ছাত্রনেতা শামীম হোসেন শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এসব মন্তব্য দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

শিক্ষাবিদদের একটি অংশও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, দেশের এক অঞ্চলের শিক্ষার্থী যদি কোমরসমান পানি অতিক্রম করে পরীক্ষা দেয় এবং অন্য অঞ্চলের শিক্ষার্থী স্বাভাবিক পরিবেশে পরীক্ষা দেয়, তাহলে সেটিকে সমতাভিত্তিক মূল্যায়ন বলা কঠিন। তার মতে, পরীক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক নীতি হওয়া উচিত।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ মনে করেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় থাকলে পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হতো। গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক রাশেদা কে চৌধুরীও বলেন, প্রতি বর্ষা মৌসুমেই একই ধরনের সংকট দেখা দেয়। তাই দীর্ঘমেয়াদে পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি পুনর্বিবেচনা এবং দুর্যোগকালীন শিক্ষা ব্যবস্থাপনার একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি।

এদিকে সমালোচনার মধ্যে দায়িত্ব নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য সামনে এসেছে। বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম ছাড়া অন্য কোনো অঞ্চলে পরীক্ষা স্থগিত করার মতো পরিস্থিতি রয়েছে—এমন সুস্পষ্ট সুপারিশ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের কাছে পৌঁছায়নি। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানিয়েছেন, সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, দুর্যোগের কারণে পরীক্ষা স্থগিতের বিষয়টি বিবেচনায় ছিল। তবে কোন কোন এলাকায় পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব নয়, সে বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে স্পষ্ট ও সময়োপযোগী তথ্য না পাওয়ায় পূর্বনির্ধারিত সূচি বহাল রাখা হয়। যদিও কুমিল্লা সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা তুজ জোহরা বলেছেন, পরীক্ষা স্থগিত বা কেন্দ্র পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত শিক্ষা বোর্ডের। ভোরের পর জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল।

পরিস্থিতি নিয়ে রাতে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করে। বিবৃতিতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সাধারণ মানুষের উদ্বেগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে বলা হয়, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির কারণে পরীক্ষা ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। তবে দেশের অন্যান্য বোর্ডের অধিকাংশ পরীক্ষাকেন্দ্র পরিচালনার উপযোগী রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই অন্যান্য বোর্ডে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কুমিল্লায় পরিস্থিতি ছিল সবচেয়ে উদ্বেগজনকগুলোর একটি। মাত্র তিন ঘণ্টায় ১০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে শহরের বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ, ভাষাসৈনিক অজিত গুহ কলেজসহ কয়েকটি পরীক্ষাকেন্দ্রের নিচতলায় পানি প্রবেশ করে। সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের শিক্ষার্থীরা জানান, জলাবদ্ধতার কারণে অনেকেই সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি। কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মহসিন বলেন, নিচতলার কক্ষে পানি উঠে যাওয়ায় পরীক্ষার্থীদের দ্রুত ওপরের তলায় স্থানান্তর করা হয়। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহসান পারভেজ জানান, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী একটি কেন্দ্র অজিত গুহ মহাবিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়েছে।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, সিটি করপোরেশনের কর্মীদের নিয়ে পরীক্ষার্থীদের নিরাপদে কেন্দ্রে পৌঁছানো এবং বের করে আনার জন্য নৌকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যাতে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ কিছুটা হলেও কমানো যায়।

শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে চরম আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। তাই ভবিষ্যতে জাতীয় পাবলিক পরীক্ষা আয়োজনের ক্ষেত্রে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, বিকল্প সময়সূচি, আঞ্চলিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বয় ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করেই পরীক্ষা পরিচালনার নীতি নির্ধারণ করা উচিত।

বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের একাংশ দ্রুত একটি সমন্বিত ও মানবিক সিদ্ধান্ত প্রত্যাশা করছেন। একই সঙ্গে তারা চান, ভবিষ্যতে যেন কোনো শিক্ষার্থীকে জীবনঝুঁকি কিংবা চরম দুর্ভোগের মধ্যে পরীক্ষা দিতে না হয়। শিক্ষা প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, ন্যায়সংগত মূল্যায়ন এবং জনআস্থা—এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত