তিন ঘণ্টার চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে আদমজী ইপিজেডের আগুন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
  • ৩১ বার
তিন ঘণ্টার চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে আদমজী ইপিজেডের আগুন

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে অবস্থিত আদমজী এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (ইপিজেড)-এর একটি তৈরি পোশাক কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কয়েক ঘণ্টা ধরে উৎকণ্ঠায় ছিল পুরো এলাকা। বুধবার (১৫ জুলাই) ভোররাতে অন্তত অ্যাপারেলস লিমিটেড নামের একটি পোশাক কারখানার গুদামে আগুনের সূত্রপাত হলে মুহূর্তের মধ্যে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের তীব্রতা ও ঘন ধোঁয়ায় কারখানা এলাকা এবং আশপাশের পরিবেশ আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে টানা প্রায় তিন ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।

ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, ভোর প্রায় ৪টা ১০ মিনিটের দিকে কারখানার গুদামে আগুন লাগে। গুদামে সংরক্ষিত তৈরি পোশাক, কাপড়, প্যাকেজিং সামগ্রী এবং অন্যান্য দাহ্য উপকরণ থাকায় আগুন দ্রুত বিস্তার লাভ করে। আগুনের লেলিহান শিখা ও ধোঁয়া অনেক দূর থেকেও দেখা যাচ্ছিল বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় ফায়ার সার্ভিস তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাপক উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম শুরু করে।

ঘটনার খবর পেয়ে আদমজী, কাঁচপুর, শিবু মার্কেট ও নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থেকে মোট ১১টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। এর মধ্যে ৯টি ইউনিট সরাসরি আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে এবং অতিরিক্ত দুটি ইউনিট প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়। অগ্নিনির্বাপণকর্মীরা দ্রুত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করে এবং আগুন যাতে কারখানার অন্যান্য অংশ কিংবা পাশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছড়িয়ে না পড়ে, সে লক্ষ্যে সমন্বিতভাবে কাজ পরিচালনা করেন।

প্রায় তিন ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার পর সকাল ৭টা ১০ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপরও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা দীর্ঘ সময় ধরে কুলিং কার্যক্রম পরিচালনা করেন, যাতে কোথাও আগুনের লুকিয়ে থাকা উৎস থেকে নতুন করে শিখা সৃষ্টি না হয়। শিল্পাঞ্চলে এ ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে কুলিং কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ঢাকা বিভাগের উপ-পরিচালক মো. ছালেহ উদ্দিন ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে ৯টি ইউনিট সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে এবং অতিরিক্ত দুটি ইউনিট প্রস্তুত ছিল। তিনি জানান, অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রমের সময় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে আগুন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনার পর পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয় এবং পরবর্তীতে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, যা স্বস্তির বিষয় হিসেবে দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে আগুনে কারখানার গুদামের কতটুকু ক্ষতি হয়েছে কিংবা কী পরিমাণ মালামাল পুড়ে গেছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানানো হয়নি। ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিস্তারিত মূল্যায়ন করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কেও এখনো নিশ্চিত কিছু জানা যায়নি। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার পর তদন্ত শুরু হবে। তদন্তের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট, যান্ত্রিক ত্রুটি, দাহ্য পদার্থের অসতর্ক ব্যবস্থাপনা অথবা অন্য কোনো কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। একই সঙ্গে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং কারখানার নিরাপত্তা মানদণ্ডও পর্যালোচনা করা হবে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভোররাতে হঠাৎ ধোঁয়া ও আগুনের শিখা দেখতে পেয়ে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। অনেকে ঘর থেকে বেরিয়ে নিরাপদ স্থানে অবস্থান নেন। শিল্পাঞ্চলে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের আশঙ্কায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। তবে ফায়ার সার্ভিস দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনায় বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে তারা মন্তব্য করেন।

আদমজী ইপিজেড দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল, যেখানে অসংখ্য রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিদিন হাজার হাজার শ্রমিক এখানে কাজ করেন। ফলে এ ধরনের শিল্পাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি কারখানার ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং আশপাশের কারখানা, শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং উৎপাদন ব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিল্পাঞ্চলে নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা মহড়া, বৈদ্যুতিক লাইন পরিদর্শন, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশে অতীতেও বিভিন্ন শিল্পকারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যার অনেকগুলোতে প্রাণহানি ও ব্যাপক আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এসব ঘটনার পর বারবার শিল্পকারখানায় নিরাপত্তা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও বিভিন্ন সময় নানা ধরনের ত্রুটি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেবল দুর্ঘটনার পর তদন্ত নয়, বরং নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণই ভবিষ্যতে এমন ঘটনা কমিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

এদিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস এবং কারখানা কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রেখেছে। তদন্ত শেষে আগুনের প্রকৃত কারণ এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সুপারিশও তদন্ত প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।

প্রাথমিকভাবে কোনো প্রাণহানির খবর না থাকলেও শিল্পকারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত অগ্নি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত নিরাপত্তাকর্মী এবং শ্রমিকদের নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। বুধবারের এই ঘটনায় দ্রুত ও সমন্বিতভাবে ফায়ার সার্ভিসের পদক্ষেপ বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত