প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা-সংক্রান্ত দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধে মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) কার্যত অচল হয়ে পড়ে রাজধানী ঢাকা। সকাল থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ও অবরোধ দিনের বিভিন্ন সময়ে রাজধানীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ছড়িয়ে পড়লে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। উত্তরা, সায়েন্স ল্যাব, নীলক্ষেত, পলাশী, বকশীবাজার, ইসিবি চত্বর, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, তেজগাঁও এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যান চলাচল ব্যাহত হয়। এর প্রভাব পড়ে পুরো নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থায়। সাধারণ যাত্রী, অফিসগামী মানুষ, পরীক্ষার্থী, রোগী, বিমানযাত্রী এবং বিভিন্ন পেশাজীবী চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েন।
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেওয়া আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা-সংক্রান্ত দাবিতে সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। প্রথমে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সায়েন্স ল্যাব মোড়ে অবস্থান নিয়ে ধানমন্ডি থেকে নিউমার্কেটমুখী সড়ক বন্ধ করে দেন তারা। এর ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই সড়কের উভয় পাশে শত শত বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল এবং পণ্যবাহী যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। যানবাহনগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকায় অনেক যাত্রী বাধ্য হয়ে পায়ে হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
পরবর্তীতে আন্দোলনকারীরা সায়েন্স ল্যাব এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বর, পলাশীর মোড় হয়ে বকশীবাজারে অবস্থিত ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সামনে অবস্থান নেন। সেখানে তারা বিক্ষোভ সমাবেশ করেন এবং প্রায় এক ঘণ্টা সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে। এতে পুরান ঢাকা, আজিমপুর, নীলক্ষেত, শাহবাগ ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। ট্রাফিক পুলিশ বিকল্প সড়ক ব্যবহার করে যান চলাচল সচল রাখার চেষ্টা করলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
দিনের শেষভাগে আন্দোলনের কেন্দ্র আবার পরিবর্তিত হয়ে যায়। সন্ধ্যার দিকে আন্দোলনকারীরা জাতীয় সংসদ ভবনের মূল ফটকের সামনে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অবস্থান নেন। কয়েক দফায় সড়ক অবরোধের কারণে রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এই সড়কে যান চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এর প্রভাব মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে তেজগাঁও, ফার্মগেট, বিজয় সরণি, মোহাম্মদপুর এবং আশপাশের সড়কগুলোতে। অফিস ছুটির সময় হওয়ায় দুর্ভোগ আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার রফিকুল ইসলাম জানান, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বন্ধ থাকায় রাজধানীর একাধিক বিকল্প সড়কেও অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ সৃষ্টি হয়। ফলে ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তিনি বলেন, সন্ধ্যার সময় এমনিতেই যানবাহনের চাপ বেশি থাকে। এর সঙ্গে অবরোধ যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
রাজধানীর উত্তরা এলাকাতেও একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আজমপুর থেকে বিএনএস সেন্টার পর্যন্ত ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে সড়কে অবস্থান নেন। দুপুরের পর বিভিন্ন স্কুল, কলেজ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সেখানে যোগ দিলে আন্দোলনের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। একপর্যায়ে মহাসড়কে যান চলাচল প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। বিমানবন্দর, আবদুল্লাহপুর, টঙ্গী এবং গাজীপুরমুখী সড়কে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। বহু যাত্রীকে লাগেজ হাতে নিয়ে দীর্ঘ পথ হেঁটে যেতে দেখা যায়। বিভিন্ন সময়ে প্রায় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সড়ক বন্ধ থাকায় পুরো করিডোরে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
ইসিবি চত্বরেও শিক্ষার্থীরা সড়কে অবস্থান নিলে ক্যান্টনমেন্ট, কুড়িল, মিরপুর এবং বিমানবন্দরমুখী সড়কে তীব্র যানজট দেখা দেয়। গুলশান ট্রাফিক বিভাগের এক ফেসবুক বার্তায় জানানো হয়, উত্তরা বিএনএস টাওয়ার এবং ইসিবি চত্বরে শিক্ষার্থীদের অবস্থানের কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিমানবন্দরমুখী অংশে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছে। যানবাহনের সারি কুড়িল ফ্লাইওভার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
ট্রাফিক সার্জেন্ট আশিকুর রহমান বলেন, বিকেল ৫টার পর সীমিত আকারে যান চলাচল শুরু হলেও সারা দিনের জমে থাকা যানবাহনের চাপের কারণে যানজট দ্রুত নিরসন সম্ভব হয়নি। অনেক এলাকায় রাত পর্যন্ত যান চলাচল ধীরগতিতে চলতে থাকে।
শিক্ষার্থীদের এই কর্মসূচির প্রভাব পড়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও। বিমানবন্দরে যাতায়াতকারী বহু যাত্রী নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে না পেরে চরম উদ্বেগের মধ্যে পড়েন। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দেশে ফেরা কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা মো. আব্বাস জানান, তিনি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাঁর স্বজনরা তাঁকে নিতে আসার কথা থাকলেও সড়ক অবরোধের কারণে তারা দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে ছিলেন। ফলে বিমানবন্দরে তাঁকে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়।
বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সড়ক অবরোধের কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক রুটের কয়েকটি ফ্লাইট নির্ধারিত সময়ের কিছু পরে ছেড়ে যায়। তবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মুহাম্মাদ কাউছার মাহমুদ জানিয়েছেন, পরিস্থিতির কারণে কোনো ফ্লাইট বাতিল করা হয়নি। যাত্রীদের সহায়তায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় সমন্বয় করেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সারাদিন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখে। উত্তরা পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোরশেদ আলম বলেন, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে শিক্ষার্থীদের একাধিকবার সড়ক ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ সংযমের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেছে।
ট্রাফিক পুলিশও রাজধানীবাসীকে প্রয়োজন ছাড়া সড়কে বের না হওয়ার এবং সম্ভব হলে বিকল্প পথ ব্যবহার করার অনুরোধ জানায়। বিভিন্ন মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হলেও একই সময়ে রাজধানীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অবরোধ চলায় যান চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়নি।
শহর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবহন বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানী ঢাকার সড়ক নেটওয়ার্ক এমনিতেই উচ্চমাত্রার যানবাহনের চাপে পরিচালিত হয়। ফলে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সড়ক সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব দ্রুত পুরো নগরীতে ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিকল্প রুট ব্যবস্থাপনা, আগাম ট্রাফিক নির্দেশনা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বিত যোগাযোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, তাদের দাবি এবং জনদুর্ভোগ—সবকিছু মিলিয়ে মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকার একটি ব্যস্ত কর্মদিবস পরিণত হয় দীর্ঘ যানজট, অনিশ্চয়তা ও ভোগান্তির দিনে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান হবে এবং একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দাবি ও সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচলের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করা সম্ভব হবে।