প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বকাপের মঞ্চে আরেকটি স্মরণীয় রাতের সাক্ষী থাকল ফুটবল বিশ্ব। উত্তেজনা, শারীরিক লড়াই, স্নায়ুচাপ এবং শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় ভরা এক সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে আর্জেন্টিনা। আটলান্টার গর্জনময় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে আবারও দলের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে উঠলেন লিওনেল মেসি। গোল না করেও দুই গোলেই সরাসরি অবদান রেখে তিনি প্রমাণ করলেন, বয়স যতই বাড়ুক, সবচেয়ে বড় মঞ্চে তিনিই এখনো আর্জেন্টিনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নেতা।
ম্যাচটি শুরু থেকেই ছিল উত্তেজনায় ঠাসা। দুই দলই বুঝে শুনে খেলতে নেমেছিল। শুরু থেকেই বলের দখল নিয়ে লড়াইয়ের পাশাপাশি একের পর এক শক্ত ট্যাকল, ফাউল এবং শারীরিক সংঘর্ষে ম্যাচের গতি বারবার থেমে যায়। প্রথম ১০ মিনিটেই রেফারিকে একাধিকবার বাঁশি বাজাতে হয়। আর্জেন্টিনার লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহ্যামের মধ্যকার দ্বৈরথ মাঝমাঠের লড়াইকে আরও তীব্র করে তোলে। অন্যদিকে অ্যান্থনি গর্ডন, মরগান রজার্স, নিকোলাস ট্যাগলিয়াফিকো এবং রিস জেমসদের মধ্যে বলের জন্য কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ম্যাচটিকে শুরু থেকেই শারীরিক রূপ দেয়।
প্রথমার্ধে দুই দলের রক্ষণভাগ এতটাই সংগঠিত ছিল যে গোলের সুযোগ তৈরি করাই কঠিন হয়ে পড়ে। ম্যাচের ২৪ মিনিটে প্রথম হাইড্রেশন ব্রেকের সময় পর্যন্ত কোনো দলই উল্লেখযোগ্য শট নিতে পারেনি। তবে ফাউলের সংখ্যা তখনই দুই অঙ্কে পৌঁছে যায়। আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড—দুই দলই বুঝিয়ে দেয়, কোনোভাবেই সহজে প্রতিপক্ষকে জায়গা ছেড়ে দেওয়া হবে না।
৩২ মিনিটে ম্যাচের প্রথম উল্লেখযোগ্য সুযোগ পায় ইংল্যান্ড। বক্সের ঠিক বাইরে এনজো ফার্নান্দেজের ফাউলে ফ্রি-কিক আদায় করেন জুড বেলিংহ্যাম। সেখান থেকে ভেসে আসা বলে জন স্টোনসের হেড আর্জেন্টিনার রক্ষণে কিছুটা চাপ তৈরি করলেও গোলের দেখা মেলেনি। এরপর ম্যাচে উত্তেজনা আরও বাড়ে। মেসিকে থামাতে গিয়ে এলিয়ট অ্যান্ডারসন হলুদ কার্ড দেখেন। কিছুক্ষণ পর শক্ত ট্যাকলের কারণে আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্টিনেসও বুকিং হন। প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকলেও লড়াইয়ের তীব্রতা দর্শকদের এক মুহূর্তের জন্যও ম্যাচ থেকে চোখ সরাতে দেয়নি।
বিরতির পর দুই দলই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে শুরু করে। ইংল্যান্ড দ্রুত গতিতে আর্জেন্টিনার রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। ৫৫ মিনিটে সেই চাপই ফল এনে দেয়। অ্যান্থনি গর্ডনের দুর্দান্ত আক্রমণ থেকে ইংল্যান্ড এগিয়ে গেলে স্টেডিয়ামে উপস্থিত সমর্থকদের একাংশ উল্লাসে ফেটে পড়ে। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ইংল্যান্ডের হাতেই চলে গেছে।
কিন্তু আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো কঠিন মুহূর্তে নিজেদের ফিরে পাওয়ার ক্ষমতা। লিওনেল স্কালোনি দ্রুত কৌশল বদল করেন। মাঝমাঠে নতুন ছন্দ আনতে পরিবর্তন আনেন দলে। নিকোলাস ওটামেন্ডি, রদ্রিগো ডি পল এবং গঞ্জালো মন্তিয়েলকে মাঠে নামিয়ে দলের গতি ও ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন তিনি। সেই পরিবর্তনের ইতিবাচক প্রভাব খুব দ্রুতই দেখা যায়।
মেসি ধীরে ধীরে নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসেন। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ গড়ে তোলা, ডিফেন্স ভাঙার মতো পাস দেওয়া এবং সতীর্থদের সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার কাজ তিনি নিখুঁতভাবে করতে থাকেন। তাঁর নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা বলের দখল বাড়ায় এবং ইংল্যান্ডের রক্ষণকে চাপে ফেলতে শুরু করে।
সমতায় ফেরার মুহূর্তটিও আসে মেসির পা থেকেই। মাঝমাঠ থেকে তাঁর নিখুঁত পাস ধরে এনজো ফার্নান্দেজ দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে গোল করে ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে ফিরিয়ে আনেন। গোলের পর পুরো দল যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়। ইংল্যান্ডও পাল্টা আক্রমণে যাওয়ার চেষ্টা করলেও আর্জেন্টিনার রক্ষণ তখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী।
ম্যাচের শেষ দিকে স্কালোনির আরেকটি পরিবর্তন ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ৮০ মিনিটে নিকোলাস ট্যাগলিয়াফিকোর জায়গায় মাঠে নামানো হয় লাউতারো মার্তিনেজকে। তাঁর উপস্থিতিতে আর্জেন্টিনার আক্রমণে গতি ও ধার দুটোই বেড়ে যায়। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে আবারও জাদু দেখান লিওনেল মেসি। কয়েকজন ডিফেন্ডারকে টেনে নিয়ে নিখুঁত সময়জ্ঞান ও অসাধারণ দৃষ্টিভঙ্গিতে লাউতারো মার্তিনেজের উদ্দেশে বাড়িয়ে দেন একটি অসাধারণ পাস। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ঠান্ডা মাথায় জয়সূচক গোল করেন লাউতারো।
গোলের পর পুরো স্টেডিয়াম নীল-সাদা উল্লাসে ফেটে পড়ে। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা হতাশায় মাটিতে বসে পড়েন। শেষ কয়েক মিনিটে সমতায় ফেরার মরিয়া চেষ্টা চালালেও আর্জেন্টিনার রক্ষণ আর কোনো সুযোগ দেয়নি। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে আলবিসেলেস্তেরা।
ম্যাচ শেষে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি লিওনেল মেসি। শেষ বাঁশি বাজার পর হাঁটু গেড়ে বসে তিনি উচ্ছ্বাসে চিৎকার করেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য সাফল্যের সাক্ষী হলেও বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন জয় তাঁর কাছে যে কতটা মূল্যবান, সেই দৃশ্যই যেন তার প্রমাণ। সতীর্থরা তাঁকে ঘিরে উদ্যাপনে মেতে ওঠেন এবং গ্যালারিতে উপস্থিত হাজারো আর্জেন্টাইন সমর্থক বিজয়ের গান গেয়ে রাতটিকে স্মরণীয় করে রাখেন।
এই জয়ের মাধ্যমে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল আর্জেন্টিনা। আগামী ১৯ জুলাই নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শক্তিশালী স্পেনের মুখোমুখি হবে তারা। ইউরোপের অন্যতম সেরা দল স্পেনের বিপক্ষে লড়াই সহজ হবে না। তবে মেসির অভিজ্ঞতা, স্কালোনির কৌশল এবং দলের বর্তমান আত্মবিশ্বাস আর্জেন্টিনাকে নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজেদের গৌরবময় অধ্যায়ে আরেকটি নতুন পৃষ্ঠা যোগ করার সামনে দাঁড়িয়ে এখন আর্জেন্টিনা। আর মাত্র একটি জয় দূরে দ্বিতীয় টানা বিশ্বকাপ শিরোপা। ফুটবলপ্রেমীদের চোখ এখন মেটলাইফ স্টেডিয়ামের দিকে, যেখানে নির্ধারিত হবে বিশ্ব ফুটবলের নতুন রাজা। আর আর্জেন্টাইন সমর্থকদের একটাই বিশ্বাস—লিওনেল মেসির হাত ধরেই হয়তো আবারও বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি উঠবে নীল-সাদা জার্সিধারীদের হাতে।