প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় চট্টগ্রামে নিহত প্রথম আন্দোলনকারী হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরামের মৃত্যুর দুই বছর পূর্ণ হলেও তাঁর হত্যা মামলার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। পরিবারের অভিযোগ, মামলার তদন্ত কোন পর্যায়ে রয়েছে, কারা গ্রেপ্তার হয়েছে কিংবা তদন্তে কী অগ্রগতি হয়েছে—এসব বিষয়ে তারা কোনো তথ্যই জানে না। বিচারহীনতার দীর্ঘ অপেক্ষা এবং প্রিয়জন হারানোর বেদনা নিয়ে এখনও দিন কাটছে কক্সবাজারের পেকুয়ায় বসবাসরত ওয়াসিমের পরিবারের।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম নগরীর মুরাদপুর এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে সংঘর্ষের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরাম। তাঁর মৃত্যু সেই সময়ের আন্দোলনে চট্টগ্রামের অন্যতম আলোচিত ঘটনায় পরিণত হয়। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে আলোচিত সেই মামলাটি এখন তদন্তের দীর্ঘসূত্রতায় আটকে আছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ওয়াসিম আকরামের বাড়ি কক্সবাজার জেলার পেকুয়া উপজেলার বাঘগুজারা বাজারপাড়া এলাকায়। তিনি চট্টগ্রাম কলেজে স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। পাশাপাশি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং পেকুয়া উপজেলা ছাত্রদল ও চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিতেন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়।
দুই বছর পরও সন্তানের হত্যার বিচার না পাওয়ার কষ্ট আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন তাঁর বাবা-মা। ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম জানান, ঘটনার সময় তিনি দেশের বাইরে ছিলেন। পরে দেশে ফিরে জানতে পারেন, তাঁর স্ত্রী মামলা করেছেন। তবে মামলায় কারা আসামি হয়েছেন কিংবা বর্তমানে তদন্তের অবস্থা কী—এসব বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছুই জানেন না। তাঁর ভাষায়, পরিবারের সঙ্গে তদন্ত সংস্থার কোনো ধরনের যোগাযোগ হয়নি। ফলে মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে তারা কার্যত অন্ধকারে রয়েছেন।
মায়ের কষ্ট আরও গভীর। ওয়াসিমের মা জোসনা বেগম বলেন, সময় যতই পেরিয়ে যাক, ছেলের স্মৃতি এক মুহূর্তের জন্যও মুছে যায়নি। ঈদ কিংবা অন্য কোনো আনন্দের দিনে সমবয়সী ছেলেদের নতুন পোশাক পরে মসজিদে যেতে দেখলে তিনি নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন না। একজন সন্তানের অনুপস্থিতি যে একটি পরিবারকে কতটা নিঃস্ব করে দিতে পারে, তাঁর কথাতেই ফুটে ওঠে সেই বেদনা।
ঘটনার এক মাসেরও বেশি সময় পর, ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় হত্যা মামলা হিসেবে ঘটনাটি নথিভুক্ত করা হয়। বাদী হন নিহত ওয়াসিমের মা জোসনা বেগম। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তৎকালীন সরকারের একাধিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাম উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা, সাবেক মন্ত্রী, সাবেক মেয়র, সাবেক সংসদ সদস্যসহ মোট ১০৮ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ১০০ থেকে ১৫০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বিকেল ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে মুরাদপুর এলাকার বারকোড রেস্টুরেন্টের সামনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচি চলছিল। সে সময় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালানো হয়। এজাহারে দাবি করা হয়েছে, হামলায় আগ্নেয়াস্ত্র, ককটেল, লাঠিসোঁটা, হকিস্টিক ও ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে ওয়াসিম আকরাম বুকে ও নাভিতে গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাঁকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
তবে মামলার তদন্তে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন পরিবারের সদস্যরা। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় পার হলেও তারা তদন্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে নিয়মিত কোনো তথ্য পাননি। মামলার বর্তমান অবস্থা জানার জন্যও তাদের উদ্যোগ নিতে হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে অনিশ্চয়তা তাদের মানসিক কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিলে শুধু ভুক্তভোগী পরিবারই নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিচারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তাই সংবেদনশীল মামলাগুলোর ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ, দ্রুত এবং প্রমাণনির্ভর তদন্ত নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে আইনগত সীমার মধ্যে ভুক্তভোগী পরিবারকে অবহিত রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে তারা মনে করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সে সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, প্রাণহানি এবং সহিংসতার একাধিক ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার বিচার ও তদন্ত নিয়ে জনমনে এখনও ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। বিশেষ করে যেসব ঘটনায় প্রাণহানি ঘটেছে, সেসব মামলার অগ্রগতি নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হলে বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই জানান, ওয়াসিম ছিলেন মিশুক ও ভদ্র স্বভাবের একজন তরুণ। পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও তাঁর অংশগ্রহণ ছিল। তাঁর অকাল মৃত্যু পরিবার, স্বজন এবং এলাকার মানুষের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছিল। দুই বছর পরও সেই শোকের আবহ অনেকের স্মৃতিতে অম্লান।
ওয়াসিমের পরিবার এখন কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়া দেখতে চায়। তাদের প্রত্যাশা, তদন্ত দ্রুত শেষ হবে এবং আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম এগিয়ে যাবে। একই সঙ্গে প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা হবে।
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ওয়াসিম আকরামের পরিবারের কাছে সময় যেন থমকে আছে ২০২৪ সালের সেই রক্তাক্ত জুলাই বিকেলেই। প্রতিটি উৎসব, প্রতিটি পারিবারিক আয়োজন এবং প্রতিটি নতুন দিনের শুরু তাদের মনে করিয়ে দেয় হারিয়ে যাওয়া এক সন্তানের কথা। বিচারপ্রক্রিয়া যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই বাড়ছে তাদের অপেক্ষা। সেই অপেক্ষার শেষ কোথায়, তার উত্তর এখনো সময়ই দিতে পারেনি।