প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে ২-১ গোলের জয় তুলে নিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে আর্জেন্টিনা। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে আবেগ, গর্ব এবং আত্মবিশ্বাসের মিশেলে নিজের প্রতিক্রিয়া জানান আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনি। তিনি বলেন, এই জয় শুধু একটি ম্যাচ জেতার গল্প নয়; এটি এমন একটি দলের প্রতিচ্ছবি, যারা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বিশ্বাস হারায় না এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেদের লক্ষ্যে অটল থাকে।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে শুরু থেকেই ইংল্যান্ড ছিল সুসংগঠিত ও আত্মবিশ্বাসী। ম্যাচের একপর্যায়ে এগিয়েও যায় ইউরোপীয় দলটি। তবে পিছিয়ে পড়েও আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা নিজেদের পরিকল্পনা থেকে বিচ্যুত হননি। ধৈর্য, বল দখল, আক্রমণ গড়ে তোলা এবং প্রতিপক্ষের দুর্বল মুহূর্তকে কাজে লাগানোর কৌশলই শেষ পর্যন্ত দলকে এনে দেয় কাঙ্ক্ষিত জয়।
সংবাদ সম্মেলনে স্কালোনি বলেন, এই দলকে নিয়ে তিনি গর্বিত। কারণ খেলোয়াড়রা কখনোই হাল ছেড়ে দেয়নি। ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পরও সবাই বিশ্বাস রেখেছিল যে ম্যাচে ফেরা সম্ভব। সেই বিশ্বাসই শেষ পর্যন্ত জয় এনে দিয়েছে। তার মতে, বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে কেবল প্রতিভা নয়, মানসিক দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাসই সবচেয়ে বড় শক্তি।
কোচের মতে, পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই আর্জেন্টিনা নিজেদের মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছে। কঠিন মুহূর্তে খেলোয়াড়রা একে অপরকে সমর্থন করেছে, নিজেদের ওপর আস্থা রেখেছে এবং দলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও সেই একই দৃশ্য দেখা গেছে।
স্কালোনি বিশেষভাবে প্রশংসা করেন অধিনায়ক লিওনেল মেসির। যদিও ম্যাচে মেসি গোল করেননি, তবু দুটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাসিস্ট করে দলের জয়ে সবচেয়ে বড় অবদান রাখেন তিনি। কোচ বলেন, মেসি শুধু আক্রমণভাগে নয়, পুরো ম্যাচজুড়ে দলের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করেছেন। কখন গতি বাড়াতে হবে, কখন খেলা ধীর করতে হবে কিংবা কোন মুহূর্তে সতীর্থকে বল দিতে হবে—এসব সিদ্ধান্ত তিনি অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে নিয়েছেন।
স্কালোনির ভাষায়, মেসির অভিজ্ঞতা এবং নেতৃত্ব তরুণ খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। কঠিন মুহূর্তে তার উপস্থিতি পুরো দলকে স্থির থাকতে সাহায্য করে। এমন একজন ফুটবলারের সঙ্গে কাজ করা প্রতিটি কোচের জন্যই সৌভাগ্যের বিষয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শুধু নিজের দল নয়, প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ডেরও প্রশংসা করেন আর্জেন্টিনা কোচ। তিনি বলেন, টমাস টুখেলের অধীনে ইংল্যান্ড অত্যন্ত সংগঠিত ও কৌশলগতভাবে শক্তিশালী একটি দলে পরিণত হয়েছে। ম্যাচের বড় একটি সময় আর্জেন্টিনাকে চাপে রেখেছিল তারা। রক্ষণভাগ থেকে শুরু করে মাঝমাঠ ও আক্রমণে ইংল্যান্ডের সমন্বয় ছিল প্রশংসনীয়।
স্কালোনি বলেন, এমন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে জয় পাওয়া কখনো সহজ নয়। খেলোয়াড়দের ধৈর্য, একাগ্রতা এবং নিজেদের পরিকল্পনার প্রতি বিশ্বাসই শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। তিনি মনে করেন, এই জয় ভবিষ্যতের জন্যও দলকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল জয়কে অবশ্য শেষ সাফল্য হিসেবে দেখতে নারাজ আর্জেন্টিনা কোচ। তার মতে, এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটি বাকি। সামনে অপেক্ষা করছে ইউরোপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিপক্ষে শিরোপা নির্ধারণী লড়াই। তাই আবেগের জায়গা থাকলেও দ্রুত ফাইনালের প্রস্তুতিতে মনোযোগী হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
স্কালোনি বলেন, বিশ্বকাপের ফাইনাল এমন একটি ম্যাচ, যেখানে ছোট ছোট ভুলও বড় মূল্য চোকাতে হতে পারে। এজন্য প্রতিপক্ষকে যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। স্পেন একটি ভারসাম্যপূর্ণ, আক্রমণাত্মক এবং টেকনিক্যালি শক্তিশালী দল। তাদের বিপক্ষে শতভাগ প্রস্তুতি নিয়েই মাঠে নামতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, আর্জেন্টিনার এই জয়ের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে দলগত সমন্বয়। শুধু তারকা ফুটবলারদের ওপর নির্ভর না করে পুরো স্কোয়াডকে সমান গুরুত্ব দিয়ে খেলানোর কৌশলই স্কালোনির অন্যতম সাফল্য। তরুণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই দলটি টুর্নামেন্টের প্রতিটি ম্যাচে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে।
দলের ফুটবলারদের পারস্পরিক বোঝাপড়া, রক্ষণভাগের শৃঙ্খলা, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রমণভাগের কার্যকারিতা আর্জেন্টিনাকে আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছে দিয়েছে। বিশেষ করে চাপের মুহূর্তে খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস এবং লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা দলের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্ব ফুটবলপ্রেমীদের দৃষ্টি এখন ফাইনালের দিকে। একদিকে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে ইউরোপের শক্তিশালী দল স্পেন। দুই ফুটবল পরাশক্তির এই লড়াই ঘিরে ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছে ব্যাপক উত্তেজনা। ফুটবল বিশ্লেষকদের ধারণা, কৌশল, অভিজ্ঞতা এবং মানসিক দৃঢ়তার দিক থেকে এটি সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আকর্ষণীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল হতে যাচ্ছে।
লিওনেল স্কালোনি অবশ্য শিরোপার লড়াইয়ের আগে খেলোয়াড়দের সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, সেমিফাইনালের জয় দলকে অনুপ্রাণিত করবে ঠিকই, তবে ফাইনালে নতুন করে নিজেদের সেরাটা প্রমাণ করতে হবে। অতীতের সাফল্য নয়, বরং বর্তমানের পারফরম্যান্সই বিশ্বকাপের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনা আবারও প্রমাণ করেছে যে তারা বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দল। এখন তাদের সামনে একমাত্র লক্ষ্য, স্পেনকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট ধরে রাখা এবং ইতিহাসে আরও একটি গৌরবময় অধ্যায় যোগ করা।