মাদকের প্রতিবাদে বিএনপি নেতা খুনের অভিযোগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬
  • ২৫ বার
মাদকের প্রতিবাদে বিএনপি নেতা খুনের অভিযোগ

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলায় মাদকসেবনের প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে মো. ফারুক ওরফে শহীদ (৫০) নামে স্থানীয় এক বিএনপি নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসার পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় এই নেতার মৃত্যুকে ঘিরে এলাকায় শোক, ক্ষোভ ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। নিহতের পরিবারের দাবি, প্রকাশ্যে মাদকসেবনের প্রতিবাদ এবং স্থানীয় তরুণদের বিপথগামিতা নিয়ে বারবার কথা বলায় পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যার লক্ষ্যেই হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে এবং পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (১৫ জুলাই) রাত প্রায় ১১টার দিকে কবিরহাট উপজেলার সুন্দলপুর ইউনিয়নের তেঁতুলতলা বাজারসংলগ্ন পল্লী বিদ্যুতের সাব-স্টেশনের সামনে এ হামলার ঘটনা ঘটে। দোকান বন্ধ করে প্রতিদিনের মতো বাড়ি ফিরছিলেন ফারুক ওরফে শহীদ। এ সময় পেছন থেকে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে প্রথমে কবিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় নেওয়ার পথে রাত প্রায় ২টার দিকে চৌমুহনী চৌরাস্তা এলাকায় তার মৃত্যু হয়।

নিহত মো. ফারুক ওরফে শহীদ সুন্দলপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক প্রচার সম্পাদক ছিলেন। পাশাপাশি তিনি তেঁতুলতলা বাজারের একজন সুপরিচিত ব্যবসায়ী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকায় সামাজিক নানা বিষয়ে তিনি সরব থাকতেন এবং মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতেন।

ঘটনার পর স্থানীয়দের সহায়তায় দুই যুবককে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে একজন মো. আরশাদ ওরফে আকাশ (২৪), যিনি একই গ্রামের মুন মুন্সিবাড়ির আল আমিনের ছেলে। অপরজন মো. সাজ্জাদ হোসেন আকাশ (১৯), দুলালের ছেলে। স্থানীয়রা তাদের গণপিটুনি দেওয়ার পর পুলিশ এসে হেফাজতে নেয়। বর্তমানে তারা পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন এবং চিকিৎসার পর আশঙ্কামুক্ত বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

নিহতের বড় ছেলে মো. ইমরান হোসেন অভিযোগ করে বলেন, অভিযুক্ত আরশাদ ওরফে আকাশ দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদকসেবী হিসেবে পরিচিত। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা সময় অসন্তোষ থাকলেও তার বাবা এবং স্থানীয় ছাত্রদল নেতা জহির প্রকাশ্যে এর প্রতিবাদ করতেন। তার দাবি, ঘটনার আগের দিন মঙ্গলবার রাতে তেঁতুলতলা বাজারের একটি দোকানে আকাশের মাদকসেবনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। ওই সময় অভিযুক্ত বেপরোয়া আচরণ করেন এবং ছাত্রদল নেতা জহিরকে উদ্দেশ করে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ফারুক তাকে ধমক দিয়ে দোকান থেকে বের করে দেন।

ইমরানের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনার জেরে পরদিন সকালেই আকাশ বিভিন্ন মানুষের কাছে তার বাবাকে হত্যার হুমকি দেন। পরিবারের অভিযোগ, সেই হুমকিরই বাস্তব রূপ দেখা যায় বুধবার গভীর রাতে। দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার সময় ওঁৎ পেতে থাকা হামলাকারীরা পেছন থেকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে ফারুককে আঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় মাদকসংক্রান্ত নানা অভিযোগ নিয়ে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। কয়েকজন বাসিন্দার ভাষ্যমতে, মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্থানীয়ভাবে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করছিলেন ফারুক ও আরও কয়েকজন সমাজসচেতন ব্যক্তি। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কবিরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রোমেল বড়ুয়া জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে মাদকসেবনের প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার আগে নিশ্চিতভাবে ঘটনার কারণ সম্পর্কে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী মামলা গ্রহণ এবং পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আটক দুই যুবককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত আছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সংগ্রহ, আশপাশের সম্ভাব্য সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা এবং অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণের কাজ চলছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্তের অন্যান্য তথ্য হাতে পাওয়ার পর হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের ভূমিকা আরও স্পষ্ট হবে বলে তারা আশা করছেন।

ফারুকের মৃত্যুতে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা এ ঘটনাকে নৃশংস হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা এলাকায় মাদক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে সাধারণ মানুষও এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে যদি কেউ প্রাণ হারান, তবে তা সমাজের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে।

বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদকসংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা মাঝেমধ্যেই ঘটছে। তাই এ ধরনের অভিযোগের প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এবং স্থানীয় পর্যায়ে মাদক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কোনো ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে গুজব বা যাচাইবিহীন তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকার আহ্বানও জানিয়েছেন তারা।

নোয়াখালীর এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিহতের পরিবার বিচার প্রত্যাশা করছে, স্থানীয় মানুষও দ্রুত সত্য উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তদন্তের অগ্রগতির ওপরই নির্ভর করবে এই বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উন্মোচন এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত