বন্যায় কৃষি-মৎস্যে বড় ধাক্কা, ক্ষতি শত কোটি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬
  • ৪০ বার
বন্যায় কৃষি-মৎস্যে বড় ধাক্কা, ক্ষতি শত কোটি

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যার প্রভাব এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে। চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়িসহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় ফসলি জমি, মাছের ঘের, চিংড়ির পুকুর এবং গবাদিপশুর খামারে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, শুধু মৎস্য খাতেই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। পাশাপাশি ৪৩ জেলায় প্রায় এক লাখ ১৫ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ আউশ ধান ও আমনের বীজতলা। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাৎক্ষণিক পুনর্বাসনের পাশাপাশি জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থার দিকে দ্রুত অগ্রসর না হলে ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর এবং প্রাণিসম্পদ বিভাগের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। অনেক স্থানে পানি নামতে শুরু করলেও মাঠে জমে থাকা পানি কৃষি উৎপাদনের জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। বিশেষ করে সদ্য প্রস্তুত করা বীজতলা, মৌসুমি সবজির ক্ষেত এবং আউশ ধানের জমি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সরকারি তথ্য বলছে, বন্যার কারণে প্রায় এক লাখ ১৫ হাজার হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির আউশ ধান ও আমনের বীজতলা প্লাবিত হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন জেলার সবজি চাষেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। পানিতে ডুবে নষ্ট হয়েছে শাকসবজি, মরিচ, বেগুন, লাউ, পটলসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসল। কৃষকদের অনেকেই জানিয়েছেন, নতুন করে চাষ শুরু করতে তাদের অতিরিক্ত অর্থ ও কৃষি উপকরণের প্রয়োজন হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, বন্যার কারণে পাঁচ লাখেরও বেশি কৃষক সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলার মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, যশোরসহ অন্তত ১৬টি জেলা। এসব এলাকায় অনেক কৃষকের বছরের প্রধান আয়ের উৎস ছিল আউশ ধান, সবজি ও অন্যান্য মৌসুমি ফসল। আকস্মিক বন্যায় তাদের অধিকাংশ ক্ষেতই পানিতে তলিয়ে গেছে।

কৃষির পাশাপাশি বড় ধাক্কা লেগেছে দেশের মৎস্য খাতে। মৎস্য অধিদপ্তরের প্রাথমিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বন্যার পানিতে অসংখ্য মাছের ঘের, পুকুর এবং চিংড়ি চাষের প্রকল্প প্লাবিত হয়েছে। এতে মাছ ও চিংড়ির পোনা ভেসে গেছে এবং উৎপাদনের বড় অংশ নষ্ট হয়েছে। সরকারি হিসাবে এ খাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ইতোমধ্যে প্রায় ৪০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার পর প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

মৎস্য খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, একটি মাছের ঘের বা পুকুরে কয়েক মাস ধরে পরিচর্যার পর যখন উৎপাদনের সময় আসে, তখন আকস্মিক বন্যায় সব ভেসে গেলে সেই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষুদ্র খামারি ব্যাংক ঋণ কিংবা ধারদেনা করে মাছ চাষ করেছিলেন। এখন তারা নতুন করে উৎপাদন শুরু করার জন্য আর্থিক সহায়তার অপেক্ষায় রয়েছেন।

বন্যার প্রভাব পড়েছে প্রাণিসম্পদ খাতেও। বিভিন্ন এলাকায় গবাদিপশুর খামার প্লাবিত হওয়ায় পশুখাদ্যের সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক খামারিকে গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে। কোথাও কোথাও খামারে পানি ঢুকে পড়ায় পশুর স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেড়েছে। প্রাণিসম্পদ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দ্রুত পর্যাপ্ত পশুখাদ্য, চিকিৎসা এবং পুনর্বাসন সহায়তা না দিলে ক্ষুদ্র খামারিরা বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে পারেন।

কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত সহায়তা দিতে সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তিনি বলেন, যেসব এলাকার বীজতলা নষ্ট হয়েছে, সেখানে সরকারি জমিতে নতুন করে বীজতলা তৈরি করা হবে। পরে সেই চারা বিনামূল্যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হবে, যাতে তারা দ্রুত পুনরায় আবাদ শুরু করতে পারেন। একই সঙ্গে কৃষকদের প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা এবং কৃষি উপকরণ সরবরাহের বিষয়েও কাজ চলছে বলে জানান তিনি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসন নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে কৃষি ও মৎস্য খাতকে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও সক্ষম করে তুলতে হবে। সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেছেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি। তার মতে, সমন্বয়ের অভাবে অনেক সময় অর্থের অপচয় হয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ সময়মতো প্রয়োজনীয় সহায়তা পান না। তিনি আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা, দুর্যোগ-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু উপযোগী ফসল উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃষি ও মৎস্য খাত বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। তাই এই দুই খাতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি শুধু ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক বা খামারিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব বাজারে খাদ্যপণ্যের সরবরাহ, মূল্য এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। বিশেষ করে সবজি, মাছ এবং ধানের উৎপাদন কমে গেলে আগামী কয়েক মাসে বাজারে দামের ওপরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকায় পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও এখনো অনেক জায়গায় কৃষিজমি পানির নিচে রয়েছে। ফলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে আরও সময় লাগবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব প্রকাশ করা হবে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই বড় ধাক্কা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, মৎস্যচাষি ও খামারিদের জন্য দ্রুত আর্থিক সহায়তা, পুনর্বাসন এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা বিবেচনায় দুর্যোগ-সহনশীল কৃষি ও মৎস্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার দাবি আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তা না হলে প্রতি বছরই বন্যা ও অতিবৃষ্টির মতো দুর্যোগ দেশের খাদ্য উৎপাদন এবং গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত