ইরানের দ্বীপ দখলে যুক্তরাষ্ট্র, কতটা বাস্তবসম্মত?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৪ বার
ইরানের দ্বীপ দখলে যুক্তরাষ্ট্র, কতটা বাস্তবসম্মত?

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের কৌশলগত দ্বীপগুলো দখল করার পরিকল্পনা করছে? সাম্প্রতিক সামরিক হামলা, মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই প্রশ্ন আবারও গুরুত্ব পেয়েছে। তবে সামরিক সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবতা, রাজনৈতিক ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য পরিণতির দিক বিবেচনায় অধিকাংশ বিশেষজ্ঞই মনে করছেন, এমন পদক্ষেপ অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হবে।

সম্প্রতি ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের বন্দর আব্বাসসহ কয়েকটি উপকূলীয় এলাকায় এবং ঐতিহাসিক কেশম, কিশ ও আবু মুসা দ্বীপে মার্কিন বাহিনীর বিমান হামলার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রশ্ন উঠেছে, এসব হামলা কি কেবল সামরিক চাপ সৃষ্টি, নাকি ভবিষ্যতে ভূখণ্ড দখলের কোনো বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।

এর আগে চলতি বছরের মার্চে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, পেন্টাগন ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র খাগ দ্বীপ দখলের সম্ভাব্য সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছে। যদিও পরে দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর সেই আলোচনা অনেকটাই থেমে যায়। তবে সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দ্বীপ দখলের সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ না করায় বিষয়টি আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে।

সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, এ বিষয়ে তিনি এখনই কিছু বলতে চান না, কারণ তা কৌশলগতভাবে বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তার এই মন্তব্যের পর থেকেই বিভিন্ন নিরাপত্তা বিশ্লেষক সম্ভাব্য সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে মূল্যায়ন শুরু করেছেন।

লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তাবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক অ্যান্ড্রেয়াস ক্রিগের মতে, কেবল সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে বিচার করলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ইরানের ছোট দ্বীপগুলো দখল করা সম্ভব। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা, শক্তিশালী নৌবহর এবং উন্নত বিমান সক্ষমতা মোতায়েন রয়েছে। এসব শক্তি ব্যবহার করে একটি সীমিত সামরিক অভিযানে ছোট আকারের দ্বীপ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সম্ভব হতে পারে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো দ্বীপ সাময়িকভাবে দখল করা এবং দীর্ঘ সময় ধরে সেটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বিশেষ করে কেশম দ্বীপ ইরানের মূল ভূখণ্ডের খুব কাছাকাছি হওয়ায় সেটি ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন হবে। এমনকি অপেক্ষাকৃত ছোট দ্বীপগুলোও ইরানের আর্টিলারি, ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রের সরাসরি আঘাতের আওতায় থাকবে। ফলে একটি সীমিত অভিযান খুব দ্রুত পূর্ণাঙ্গ উভচর যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির অধ্যাপক নাদের হাশেমিও মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি এ ধরনের অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা রাখে। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে এর রাজনৈতিক মূল্য অনেক বেশি হতে পারে। তার মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের রাজনৈতিক সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া এবং মার্কিন সেনাদের সম্ভাব্য প্রাণহানির ঝুঁকি বিবেচনায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি দ্বীপ দখলের অভিযানের জন্যও প্রাথমিকভাবে পাঁচ থেকে দশ হাজার সেনা, উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, প্রকৌশল ইউনিট, চিকিৎসা সহায়তা এবং বিশাল লজিস্টিকস ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে। যদি একাধিক দ্বীপে একযোগে অভিযান পরিচালনা করতে হয়, তাহলে সেনা ও সামরিক সম্পদের প্রয়োজন আরও অনেক বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে এসব বাহিনীকে দীর্ঘ সময় নিরাপদে রসদ সরবরাহ করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র কোনো দ্বীপ দখল করলেও ইরান সরাসরি পাল্টা হামলা না চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়যুদ্ধের কৌশল নিতে পারে। এতে মার্কিন বাহিনীর অবস্থান রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল ও সামরিকভাবে জটিল হয়ে উঠবে। অতীতে ইরাক ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতাও এমন দীর্ঘস্থায়ী অভিযানের ঝুঁকির দিকটি স্পষ্ট করে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ পরিবাহিত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, কেবল দ্বীপ দখল করলেই ইরানকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া থেকে বিরত রাখা সম্ভব হবে না। কারণ ইরানের দক্ষিণ উপকূলে ছড়িয়ে থাকা মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, ড্রোন ঘাঁটি এবং উপকূলীয় প্রতিরক্ষা অবকাঠামো এখনো কার্যকর থাকবে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ইরানের এসব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করতে শুধু বিমান হামলা যথেষ্ট নয়। অনেক রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ঘাঁটি মাটির নিচে বা স্থানান্তরযোগ্য হওয়ায় সেগুলো ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন। ফলে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হলে ইরানের দক্ষিণ উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করতে হবে, যা কার্যত একটি পূর্ণাঙ্গ স্থলযুদ্ধের সূচনা করবে।

এ ধরনের অভিযান শুরু হলে এর অর্থনৈতিক প্রভাবও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে মাইন স্থাপন বাড়ায় বা উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালায়, তাহলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হতে পারে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, তেলের দাম এবং সামুদ্রিক বীমা খাতে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো একদিকে হরমুজ প্রণালিকে সচল রাখতে আগ্রহী হলেও অন্যদিকে তারা নিজেদের ভূখণ্ডকে কোনো সামরিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চায় না। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যদি এমন অভিযান চালায়, তাহলে আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থন পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

সব দিক বিবেচনায় আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অভিমত, সামরিক সক্ষমতা থাকলেও ইরানের কৌশলগত দ্বীপগুলো দখল করে দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল হবে। একই সঙ্গে এমন পদক্ষেপ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে আরও বিস্তৃত সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যার প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টি সম্ভাবনার আলোচনায় থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত