খালে গোসলে নেমে প্রাণ গেল চার মাদরাসা শিক্ষার্থীর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৪ বার
খালে গোসলে নেমে প্রাণ গেল চার মাদরাসা শিক্ষার্থীর

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় মর্মান্তিক এক পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো এলাকায়। মাদরাসার বিরতির সময় বাড়ি ফিরে পাশের একটি খালে গোসল করতে নেমে একসঙ্গে চার মাদরাসা শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। কয়েক মিনিটের অসাবধানতায় চারটি কচি প্রাণের এমন করুণ পরিণতি স্থানীয়দের পাশাপাশি পুরো উপজেলাজুড়ে গভীর শোক ও বেদনার সৃষ্টি করেছে। একই ঘটনায় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছে আরও দুই শিক্ষার্থী।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) বেলা প্রায় ১১টার দিকে উপজেলার চান্দেরকান্দি ইউনিয়নের বড়কান্দা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করেছে।

নিহত চার শিক্ষার্থী হলো বড়কান্দা এলাকার শামীম মিয়ার মেয়ে তাবিয়া (১৩), রুবেল মিয়ার মেয়ে আয়েশা (৯), রুবেল মিয়ার মেয়ে জান্নাত (৮) এবং বিল্লাল মিয়ার মেয়ে সুমাইয়া (১০)। তারা সবাই স্থানীয় গাউছিয়া নূরে মদিনা মহিলা মাদরাসার শিক্ষার্থী ছিলেন। একই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করা এই চার শিক্ষার্থীর একসঙ্গে মৃত্যুর ঘটনায় মাদরাসা ও পুরো এলাকায় শোকের আবহ বিরাজ করছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিনের মতো সেদিনও মাদরাসার পাঠদান চলছিল। বিরতির সময় ছয়জন শিক্ষার্থী নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে আসে। পরে তারা বাড়ির পাশের একটি খালে গোসল করতে নামে। খালের একটি অংশ তুলনামূলক গভীর হওয়ায় এবং অধিকাংশ শিশুর সাঁতার না জানার কারণে হঠাৎ তারা পানির স্রোত ও গভীরতায় বিপদে পড়ে। একপর্যায়ে তাবিয়া, আয়েশা, জান্নাত ও সুমাইয়া পানিতে তলিয়ে যায়। বাকি দুই শিক্ষার্থী কোনোভাবে খালের পাড়ে উঠে এসে চিৎকার শুরু করলে স্থানীয় লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান।

স্থানীয়রা তাৎক্ষণিকভাবে পানিতে নেমে নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধার করেন। পরে গুরুতর অবস্থায় তাদের দ্রুত রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানান, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই চারজনের মৃত্যু হয়েছে।

চান্দেরকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জিয়াউর রহমান জানান, ছয়জন শিক্ষার্থী একসঙ্গে গোসল করতে নেমেছিল। দুর্ঘটনার সময় চারজন পানিতে ডুবে যায় এবং অপর দুইজন প্রাণে রক্ষা পায়। স্থানীয়দের দ্রুত উদ্ধার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও চার শিশুকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. আশরাফুর রহমান বলেন, চার শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে আনার পর পরীক্ষা করে দেখা যায় তারা আগেই মারা গেছে। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এ ঘটনার পর নিহত শিক্ষার্থীদের বাড়িতে শোকের মাতম শুরু হয়। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। সকালে সুস্থ-স্বাভাবিক অবস্থায় মাদরাসায় যাওয়া শিশুদের নিথর দেহ বাড়িতে ফিরবে—এমন বাস্তবতা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না পরিবারের সদস্যরা। প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারাও শোকাহত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিতে ভিড় করেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্ষা মৌসুমে খাল ও জলাশয়ের পানির গভীরতা দ্রুত বেড়ে যায়। বাইরে থেকে স্বাভাবিক মনে হলেও অনেক স্থানে গভীর খাদ বা স্রোত থাকায় শিশুদের জন্য তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। অভিভাবকদের অজান্তে কিংবা পর্যাপ্ত তদারকি ছাড়া শিশুদের জলাশয়ে নামার ঘটনা প্রায়ই দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে প্রতিবছর পানিতে ডুবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশুর মৃত্যু ঘটে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাঁতার না জানা, অভিভাবকের নজরদারির অভাব এবং অনিরাপদ জলাশয়ে শিশুদের অবাধ যাতায়াতই এমন দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি শিশুদের সাঁতার শেখানো, ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধি ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

রায়পুরার এই হৃদয়বিদারক ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, সামান্য অসতর্কতা কিংবা নজরদারির ঘাটতি মুহূর্তের মধ্যে একটি পরিবার নয়, একাধিক পরিবারের জীবনকে চিরদিনের জন্য শোকের অন্ধকারে নিমজ্জিত করতে পারে। চার কিশোরীর অকাল মৃত্যুতে স্থানীয় বাসিন্দারা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত