এএসএমএল: ইউরোপের প্রথম ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানি হতে চলেছে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৭ বার
এএসএমএল: ইউরোপের প্রথম ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানি হতে চলেছে

প্রকাশ: ২০ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তিনির্ভর। আর প্রযুক্তির প্রাণভোমরা হলো মাইক্রোচিপ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর বিস্ময়কর উত্থান পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক সমীকরণ ওলটপালট করে দিয়েছে। এই নতুন যুগে চিপের চাহিদা আকাশচুম্বী। আর এই চাহিদার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে নেদারল্যান্ডসের প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান এএসএমএল। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং অত্যাধুনিক চিপ তৈরির যন্ত্র প্রস্তুতকারক হিসেবে এএসএমএল আজ একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। সম্প্রতি আর্থিক ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মধ্যে একটি জোরালো আলোচনা শুরু হয়েছে যে, এএসএমএল কি পারবে ইউরোপের ইতিহাসের প্রথম ট্রিলিয়ন ডলারের বা এক লাখ কোটি ডলার বাজারমূল্যের কোম্পানি হতে? শেয়ার বাজারের গতিপ্রকৃতি এবং বৈশ্বিক চাহিদার প্রেক্ষাপট সেই সম্ভাবনাকেই জোরালোভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এএসএমএল কেন অন্যদের থেকে আলাদা, তা বুঝতে হলে তাদের প্রযুক্তির সক্ষমতার দিকে তাকাতে হবে। তারা এমন এক বিশেষ যন্ত্র তৈরি করে, যার নাম ইইউভি বা ‘এক্সট্রিম আলট্রাভায়োলেট’। এই যন্ত্রটি ব্যবহার করে চিপের ভেতরে অত্যন্ত ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক সার্কিট খোদাই করা সম্ভব। আধুনিক এআই চিপ বা শক্তিশালী প্রসেসর তৈরির জন্য এটিই অপরিহার্য প্রযুক্তি। পৃথিবীর কোনো বড় চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান—হোক সেটি টিএসএমসি, ইন্টেল কিংবা স্যামসাং—এএসএমএল-এর এই ইইউভি প্রযুক্তি ছাড়া অত্যাধুনিক চিপ তৈরির কথা চিন্তাও করতে পারে না। কার্যত, এএসএমএল আজ চিপ তৈরির জগতের এমন এক ‘গেটকিপার’ হয়ে উঠেছে, যাকে ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তির চাকা ঘোরা অসম্ভব।

চলতি বছরে এএসএমএল-এর শেয়ার বাজারে যে অভাবনীয় উত্থান ঘটেছে, তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রবল আশাবাদের জন্ম দিয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এর মোট বাজারমূল্যকে ৭০০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি নিয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের கணிত অনুযায়ী, শেয়ারের দাম যদি ২ হাজার ৬০০ ডলারে পৌঁছায়, তবেই প্রতিষ্ঠানটি ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করবে। সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, ২০২৭ সালের জন্য এএসএমএল-এর তৈরি গুরুত্বপূর্ণ ইইউভি যন্ত্রগুলোর প্রায় পুরোটাই আগেভাগে বিক্রি হয়ে গেছে। অর্থাৎ, আগামীর বাজারের চাহিদাও এখনই তাদের হাতের মুঠোয়। এই অগ্রিম বুকিং প্রমাণ করে যে, বিশ্ব বাজারে এএসএমএল-এর প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই।

বিনিয়োগকারী এবং শেয়ার বাজার বিশ্লেষক ক্যারোলিন বেল এ বিষয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। তিনি মনে করেন, এএসএমএল-এর ইউরোপের প্রথম ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানি হওয়ার সব সম্ভাবনা বিদ্যমান। বিনিয়োগকারীরা এখন ভবিষ্যতে এই প্রতিষ্ঠানটির আকাশছোঁয়া আয়ের প্রত্যাশা করছেন, যার প্রমাণ পাওয়া যায় শেয়ারের দাম এবং সম্ভাব্য আয়ের অনুপাতের মধ্যে। তবে এই ট্রিলিয়ন ডলারের যাত্রায় কিছু চ্যালেঞ্জও লুকিয়ে আছে। গুগল, অ্যামাজন এবং মেটার মতো প্রযুক্তি দানবরা ডেটা সেন্টারের জন্য যে বিপুল বিনিয়োগ করছে, সেই গতিধারা ভবিষ্যতে বজায় থাকবে কি না, তা নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। যদি প্রযুক্তির এই বিনিয়োগে ভাটা পড়ে, তবে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে চিপের চাহিদায় এবং পরিণামে এএসএমএল-এর ওপর।

তদুপরি, এএসএমএল-এর গ্রাহকপ্রতিষ্ঠানগুলো—যেমন টিএসএমসি বা স্যামসাং—তাদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা কতটা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারবে, তা-ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের উৎপাদন বাড়লে তবেই এএসএমএল-এর যন্ত্রের চাহিদা আরও বেগবান হবে। বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং চিপ যুদ্ধের প্রভাবও এক্ষেত্রে অগ্রাহ্য করার মতো নয়। তবুও, এএসএমএল-এর প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তাদের বাজার দখল করা অদূর ভবিষ্যতে সম্ভব বলে মনে হয় না। তাই সামগ্রিক বিচারে ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানি হিসেবে এএসএমএল-এর আত্মপ্রকাশ কেবল সময়ের অপেক্ষা।

একটি সাধারণ ডাচ প্রতিষ্ঠান থেকে আজকের এই বিশ্বব্যাপী আধিপত্য বিস্তারকারী অবস্থানে উঠে আসার গল্পটি যেকোনো প্রযুক্তিপ্রেমীর জন্য অনুপ্রেরণামূলক। এএসএমএল শুধু একটি ব্যবসা করছে না, তারা বিশ্বসভ্যতাকে পরবর্তী ধাপে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কারিগরি কাঠামো তৈরি করছে। আজকের এই আধুনিক স্মার্টফোন, ডেটা সেন্টার, এমনকি স্বয়ংক্রিয় যানবাহন—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে এএসএমএল-এর তৈরি সূক্ষ্ম প্রযুক্তির ছোঁয়া। তাই ১ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক কেবল একটি সংখ্যা বা রেকর্ড নয়, এটি এএসএমএল-এর উদ্ভাবন এবং দক্ষতার একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

পরিশেষে বলা যায়, ট্রিলিয়ন ডলারের ক্লাবে প্রবেশের স্বপ্ন দেখা এএসএমএল-এর জন্য এখন আর আকাশকুসুম কল্পনা নয়, বরং বাস্তবসম্মত একটি লক্ষ্য। যদিও বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা এবং প্রযুক্তি খাতের অস্থিরতা সবসময়ই বিদ্যমান, তবুও এএসএমএল-এর যে শক্তিশালী ভিত্তি এবং ইইউভি প্রযুক্তিতে তাদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ, তাতে তাদের এই যাত্রাকে থামানো কঠিন। ইউরোপের শিল্প ও প্রযুক্তির ইতিহাসে এএসএমএল নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করতে চলেছে। হয়তো খুব শিগগিরই আমরা দেখব, নেদারল্যান্ডসের এই প্রতিষ্ঠানটি ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানির তকমা গায়ে মেখে বিশ্ব অর্থনীতিকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। চিপ বা সেমিকন্ডাক্টরের এই বাজারে যারা রাজা, তারাই ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে থাকবে—এ কথা আজ দিনের আলোর মতো পরিষ্কার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত